সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ জয়পুর : প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে রাজস্থানে (Rajasthan) এমন এক নির্দেশিকা প্রকাশ্যে এল, যা ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। জালোর (Jalore) জেলার একাধিক গ্রামে মহিলাদের ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার কার্যত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই নির্দেশিকায় স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, মহিলারা প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে বা জনসমক্ষে ফোনে কথা বলতেও পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, আধুনিক ভারতের ৭৫তম প্রজাতন্ত্র দিবসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এমন নির্দেশিকা কি সংবিধানসম্মত?

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজস্থানের জালোর জেলার অন্তত ১৫টি গ্রামে এই নির্দেশ কার্যকর করার ঘোষণা করা হয়েছে। গাজীপুর (Ghazipur) গ্রামে চৌধরি সম্প্রদায়ের একটি সভা থেকেই এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সভার সভাপতিত্ব করেন ১৪টি মহকুমা বা পট্টির সভাপতি সুজনরাম চৌধরি (Sujanram Chaudhary)। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত কোনও একক ব্যক্তির নয়, বরং চৌধরি গোষ্ঠীর পঞ্চায়েতের পাঁচ সদস্য নিয়ে গঠিত ‘পঞ্চ হিতারাম’ (Panch Hitaram)-এর সম্মিলিত মতামতের ফল।সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে (PTI) দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুজনরাম চৌধরি জানিয়েছেন, পঞ্চ হিতারামের পাঁচ সদস্য নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা করেই এই নির্দেশিকা জারি করেছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের পিছনে কী যুক্তি, তা নিয়েই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। সুজনরামের বক্তব্য, ‘আজকের দিনে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য মোবাইল প্রয়োজন। তাই স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের মোবাইল দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই মোবাইল শুধুমাত্র ঘরের ভিতর ব্যবহার করতে হবে। তাও ক্যামেরা ছাড়া কি-প্যাড ফোন হতে হবে।’
এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, শুধু অবিবাহিত মেয়েরাই নয়, পুত্রবধূদেরও একই নিয়ম মানতে হবে। ঘরের চার দেওয়ালের বাইরে কোনও ভাবেই ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল বহন করতে পারবেন না মহিলারা। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেও ফোন সঙ্গে রাখা যাবে না, এমনটাই বলা হয়েছে ওই নির্দেশিকায়। বিষয়টি সামনে আসতেই রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয় স্তরেও শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়।অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত আসলে মহিলাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত। পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার আড়ালে ‘মধ্যযুগীয় মানসিকতা’ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেই অভিযোগ তুলছেন সমাজকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি। তাঁদের বক্তব্য, সংবিধান যেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে, সেখানে স্থানীয় পঞ্চায়েত কী ভাবে এমন নির্দেশ জারি করতে পারে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে সাফাই দিয়েছেন সুজনরাম চৌধরি। তাঁর দাবি, এই নির্দেশিকা কোনও ভাবেই মহিলাদের দমন করার জন্য নয়। বরং সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ‘রক্ষা’ করতেই এই পদক্ষেপ। সুজনরামের কথায়, ‘অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ির কাজ নির্বিঘ্নে করার জন্য মহিলারা শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। ফলে শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে ফোন ব্যবহার করে। এতে তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই প্রবণতা বন্ধ করতেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ কিন্তু, এই যুক্তি মানতে নারাজ সমালোচকেরা। তাঁদের বক্তব্য, শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে তার জন্য আলাদা সচেতনতা বা নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে। তার বদলে শুধুমাত্র মহিলাদের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো একপেশে এবং বৈষম্যমূলক। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, পুরুষদের মোবাইল ব্যবহারের উপর কেন কোনও বিধিনিষেধ নেই?
এই ঘটনায় রাজস্থানের গ্রামীণ সমাজে আবারও সামনে এল পঞ্চায়েত বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে সামাজিক উদ্বেগ নতুন নয়। কিন্তু তার সমাধান কখনওই নিষেধাজ্ঞা হতে পারে না। বরং সচেতনতা, শিক্ষা এবং আইনগত কাঠামোর মধ্যেই সমস্যার সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। প্রজাতন্ত্র দিবসের মতো একটি সাংবিধানিক মূল্যবোধের বিশেষ দিনে এই নির্দেশিকা কার্যকর করার ঘোষণা আরও বেশি করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি গ্রাম বা কয়েকটি পঞ্চায়েতের বিষয় নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চেতনার উপর বড় প্রশ্নচিহ্ন। এই মুহূর্তে প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও হস্তক্ষেপের কথা জানা যায়নি। তবে বিতর্ক যত বাড়ছে, ততই চাপ বাড়ছে রাজ্য সরকারের উপর। এখন দেখার, এই নির্দেশিকা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয় এবং প্রশাসন বা আদালত এই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেয় কি না। একদিকে সমাজের রক্ষণশীল অংশের দাবি, অন্যদিকে আধুনিক ভারতের নারী স্বাধীনতার প্রশ্ন, এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই রাজস্থানের এই মোবাইল নিষেধাজ্ঞা এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rajasthan High Court live-in verdict | ২১ বছরের আগেও একত্রবাসে ছাড়! রাজস্থান হাই কোর্টের রায়ে নয়া দিশা, বিয়ের বয়স বাধা নয়, স্বাধীনতার অধিকারই সর্বোপরি




