সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ক্রিকেট বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি মঞ্চ। এত দিন যা কেবল কল্পনাতেই ছিল, সেটাই বাস্তবে করে দেখালেন ইন্দোনেশিয়ার তরুণ পেসার জেড প্রিয়ানদানা (Zed Priandana)। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এক ওভারে পাঁচ উইকেট নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তিনি। এই নজির আগে কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচে তৈরি হয়নি। মঙ্গলবার বালির (Bali) মাঠে কম্বোডিয়ার (Cambodia) বিরুদ্ধে তাঁর এই বিধ্বংসী ওভার ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। এই ম্যাচে কম্বোডিয়ার সামনে লক্ষ্য ছিল ১৬৮ রান। রান তাড়া করতে নেমে শুরুটা খুব খারাপ না হলেও ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে। ১৫ ওভার শেষে ৫ উইকেট হারিয়ে ১০৬ রান তুলেছিল কম্বোডিয়া। সমীকরণ তখনও একেবারে অসম্ভব ছিল না, শেষ পাঁচ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৬২ রান। টি-টোয়েন্টির ছোট ফরম্যাটে এই রান তাড়া করা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ ম্যাচ তখনও খোলা ছিল। ঠিক সেই সময়ই বল হাতে ঝড় তোলেন ২৮ বছর বয়সি প্রিয়ানদানা।
১৬তম ওভারে আক্রমণে আসেন ইন্দোনেশিয়ার এই পেসার। প্রথম বলেই তিনি ফিরিয়ে দেন শাহ আব্রার হুসেনকে (Shah Abrar Hussen)। পরের দুই বলে একে একে আউট হন নির্মলজিৎ সিংহ (Nirmaljit Singh) এবং চানথোইয়ান রথনক (Chanthoyean Rathnak)। টানা তিন বলে তিন উইকেট, পূর্ণ হয় তাঁর হ্যাটট্রিক। গ্যালারিতে তখন উত্তেজনার পারদ চড়ছে। পরের বলটি ছিল ডট। এরপর একটি ওয়াইড দেন প্রিয়ানদানা। কিন্তু তাতেই ছন্দ নষ্ট হয়নি। ওভারের শেষ দুই বলে তিনি তুলে নেন মংদারা সোক (Mongdara Sok) এবং পেন ভেন্নাক (Pen Vennak) -এর উইকেট। এক ওভারে পাঁচ উইকেট, কম্বোডিয়ার ইনিংস সেখানেই শেষ। ম্যাচ জিতে নেয় ইন্দোনেশিয়া, ব্যবধানে ৬০ রান। উল্লেখ্য যে, এই ম্যাচে প্রিয়ানদানা পুরো ইনিংসে মাত্র ওই এক ওভারই বল করেন। তাঁর বোলিং পরিসংখ্যান দাঁড়ায়, এক ওভার, এক রান, পাঁচ উইকেট। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন পরিসংখ্যান আগে কখনও দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক স্তরে এই কীর্তি একেবারেই প্রথম।
শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও ইন্দোনেশিয়ার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রিয়ানদানা। তিনি এই ম্যাচে ওপেনিং ব্যাটার হিসেবেও নামেন। যদিও ব্যাট হাতে বড় রান পাননি। ১১ বল খেলে করেন মাত্র ৬ রান। কিন্তু বোলিংয়ে সেই ঘাটতি একাই মিটিয়ে দেন। ম্যাচ শেষে সতীর্থদের কাঁধে ভর দিয়েই মাঠ ছাড়েন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার ডাগআউটে তখন উৎসবের আমেজ। এর আগে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক ওভারে পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু তা ছিল শুধুমাত্র ঘরোয়া ক্রিকেটে। আন্তর্জাতিক স্তরে নয়। বাংলাদেশের পেসার আল আমিন হোসেন (Al-Amin Hossain) ২০১৩-১৪ ভিক্টোরি ডে টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে এই কীর্তি করেছিলেন। পরে ভারতের কর্নাটকের অভিমন্যু মিঠুন (Abhimanyu Mithun) ২০১৯-২০ মরসুমে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে এক ওভারে পাঁচ উইকেট নেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এত দিন সর্বোচ্চ ছিল এক ওভারে চার উইকেট। ইতিহাস বলছে, এর আগে ১৪ বার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে কোনও বোলার এক ওভারে চার উইকেট নিয়েছেন। তবে পাঁচ উইকেট, এই প্রথম।

এই রেকর্ডের ফলে আবারও আলোচনায় উঠে এল উদীয়মান ক্রিকেট শক্তি হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার নাম। ক্রিকেট মানচিত্রে ইন্দোনেশিয়া এখনও বড় দলগুলির সঙ্গে তুলনীয় না হলেও, এশিয়ার সহযোগী দেশগুলির মধ্যে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের জায়গা শক্ত করছে। প্রিয়ানদানার এই পারফরম্যান্স সেই পথচলারই বড় প্রমাণ।ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের রেকর্ড শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং গোটা দেশের ক্রিকেট পরিকাঠামো ও মানসিকতার উন্নতির প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন পারফরম্যান্স ভবিষ্যতে ইন্দোনেশিয়ার তরুণ ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করবে। এক প্রাক্তন ক্রিকেটারের কথায়, ‘টি-টোয়েন্টির মতো ফরম্যাটে এক ওভারে পাঁচ উইকেট মানে শুধু দক্ষতা নয়, বরং সাহস আর মানসিক দৃঢ়তা। প্রিয়ানদানা সেটা প্রমাণ করেছে।’
এই ম্যাচের পর স্বাভাবিক ভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই একে ‘মিনি বুমরাহ মুহূর্ত’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। যদিও প্রিয়ানদানা এখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একেবারে নতুন নাম, কিন্তু এই একটি ওভারই তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে দিয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটে। বালির মাঠে মঙ্গলবার যা ঘটল, তা শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। এটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি স্থায়ী সংযোজন। ভবিষ্যতে কেউ এই রেকর্ড ভাঙতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, এক ওভারে পাঁচ উইকেট, ইন্দোনেশিয়ার জেড প্রিয়ানদানা।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Shubman Gill dropped from T20 World Cup | টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শুভমন গিল নেই কেন? নীরবতা ভাঙলেন না গৌতম গম্ভীর, নির্বাচনের বার্তায় ইঙ্গিত স্পষ্ট




