India Germany relations, Modi Merz meeting, দিল্লি-বার্লিন কূটনীতির নতুন অধ্যায়: মোদীর সঙ্গে বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলর, প্রতিরক্ষা থেকে ভিসা ছাড়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে সিলমোহর

SHARE:

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত ও জার্মানির কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দু’দিনের সরকারি সফরে ভারতে এসে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎজ (Friedrich Merz) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) -এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সারলেন। সোমবার গুজরাতের গান্ধীনগরে (Gandhinagar) অনুষ্ঠিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দিল্লি ও বার্লিনের মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, নবীকরণযোগ্য শক্তি, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ আদানপ্রদান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতাপত্র বা মউ (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। আন্তর্জাতিক কূটনীতির মহলে এই সফরকে ভারত-জার্মানি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘কৌশলগত মোড়’ বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। সমরাস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ গবেষণার মতো বিষয়গুলিতে ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনার কথা উঠে আসে আলোচনায়। উল্লেখ্য, ভারতের সমরাস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে এখনও রাশিয়ার (Russia) উপর নির্ভরতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স (Reuters) -এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্ভরতা কমাতে নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী বার্লিন। প্রয়োজনে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ভারতকে সরবরাহ করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে জার্মানি।

আরও পড়ুন : UP CM Yogi Adityanath Meets PM Narendra Modi in New Delhi | নতুন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৈঠকে বলেন, ‘ভারত ও জার্মানির সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, এই সম্পর্কের ভিত্তি অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ’। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ (Atmanirbhar Bharat) কর্মসূচিতে জার্মান বিনিয়োগের গুরুত্ব। অন্য দিকে, চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎজ় জানান, ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ জার্মান শিল্পক্ষেত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের অন্যতম বড় ঘোষণা হল ‘ট্রানজ়িট ভিসা’ সংক্রান্ত ছাড়। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জার্মানিতে অবস্থানের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের ট্রানজ়িট ভিসার প্রয়োজন হবে না বলে জানানো হয়েছে। এর ফলে ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা এবং পেশাগত সফরের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের জন্য জার্মানিতে যাতায়াত অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ আরও দৃঢ় করবে এবং দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর। জার্মানির স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ভারতের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিবাসনকে বৈধতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মের্ৎজ়। ভারতীয় চিকিৎসকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে বলে মত তাঁর। এই সিদ্ধান্ত ভারতের কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বৈঠকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি বা রিনিউএবল এনার্জি (Renewable Energy) নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সবুজ হাইড্রোজেনের মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ও জার্মানির যৌথ প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেই মত কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের। বর্তমানে ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানি ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫০০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। জার্মানির প্রায় ২০০০ সংস্থা বর্তমানে ভারতে কাজ করছে অটোমোবাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং, রাসায়নিক ও প্রযুক্তি খাতে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে দিল্লি ও বার্লিন, বিশেষত স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) এবং সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। উল্লেখ্য, জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (European Union) অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (Free Trade Agreement) নিয়ে আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, মের্ৎজের এই সফর সেই আলোচনাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এমনকী ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ (Emmanuel Macron) ভারতে আসার আগেই চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

এই সফরের সাংস্কৃতিক দিকও নজর কেড়েছে। গান্ধীনগরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎজ় অহমদাবাদের (Ahmedabad) ঐতিহাসিক সাবরমতী আশ্রম (Sabarmati Ashram) পরিদর্শন করেন। মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) জীবন ও দর্শন সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায় তাঁকে। পরে সবরমতী নদীর ধারে আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসবে অংশ নেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।প্রসঙ্গত, জার্মান চ্যান্সেলরের এই প্রথম এশিয়া সফর এবং ভারতে আগমন শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকল না। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শক্তি ও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিল এই সফর। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দিল্লি, বার্লিন সম্পর্ক যে আরও কৌশলগত ও গভীর হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi, Hardeep Singh Puri | প্রমাণভিত্তিক বিতর্কই গণতন্ত্রের শক্তি: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন