সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত ও চিন ভাল বন্ধু, ভাল প্রতিবেশী এই বার্তাই ফের এক বার জোরের সঙ্গে তুলে ধরলেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারতের ৭৭তম সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে (Droupadi Murmu) শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, গত এক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত হয়েছে। চিনের সরকারি সংবাদসংস্থা ‘শিনহুয়া’ -এর (Xinhua) প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, জিনপিং মনে করেন, ভারত-চিন সম্পর্কের এই উন্নতি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুভেচ্ছাবার্তায় চিনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘চিন সব সময়ই বিশ্বাস করে, ভাল বন্ধু ও ভাল প্রতিবেশী হওয়াই দু’দেশের জন্য সঠিক পথ।’ সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তিনি ফের টেনে আনেন বহু চর্চিত ‘ড্রাগন-হাতি’ একসঙ্গে নাচার প্রসঙ্গ। কূটনৈতিক মহলে এই শব্দবন্ধ বহু দিন ধরেই ভারত-চিন সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জিনপিংয়ের মতে, এই ‘ড্রাগন-হাতি’ যদি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোয়, তা হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অনেক সহজ হবে।
গত কয়েক বছরে ভারত-চিন সম্পর্ক যে একাধিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৯৬২ সালের যুদ্ধ এবং ১৯৬৭ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পরে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (LAC) দীর্ঘ সময় তুলনামূলক ভাবে শান্ত থাকলেও, ২০১৭ সাল থেকে পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই বছর ভুটানের ডোকলাম এলাকায় টানা ৭৩ দিন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল ভারতীয় সেনা ও চিনা বাহিনী। যদিও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সেই অচলাবস্থা কাটে।
এরপরে ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় (Galwan Valley) রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারান ভারতীয় সেনার একাধিক জওয়ান। সেই ঘটনার পর ভারত-চিন সম্পর্ক কার্যত শৈত্যের পর্যায়ে পৌঁছয়। সীমান্তে সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি পায়, কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চললেও বিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে একাধিক দফা বৈঠকের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বর্তমানে এলএসি তুলনামূলক ভাবে শান্ত বলেই জানাচ্ছে দুই দেশ। এই প্রেক্ষাপটে জিনপিংয়ের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁর কথায়, ‘আমি আশাবাদী, ভারত ও চিন পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিনিময় এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করবে।’ পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, দু’দেশের মধ্যে যেসব উদ্বেগ বা মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলিও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হবে। সুস্থ ও স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই যে চিনের লক্ষ্য, তিনি তা স্পষ্ট করেছেন।
অতিমারি পরবর্তী সময়ে ভারত ও চিনের মধ্যে যোগাযোগ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। কোভিড-১৯ অতিমারি দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক যাতায়াত বন্ধ রাখলেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দু’দেশের মধ্যে ফের সরাসরি উড়ান পরিষেবা চালু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের খবর। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটেও জিনপিংয়ের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) -এর শুল্কযুদ্ধ ও কড়া বাণিজ্যনীতির আবহে এশিয়ার শক্তিগুলির মধ্যে সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে আমেরিকার শুল্কনীতির সমালোচনা করেছে চিন। ফলে ভারত-চিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিনপিংয়ের এই শুভেচ্ছাবার্তা কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়, বরং তার মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও লুকিয়ে রয়েছে। ‘ড্রাগন-হাতি’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি যদি সংঘাতের বদলে সহযোগিতার পথে হাঁটে, তা হলে বৈশ্বিক শক্তিসাম্যেও তার প্রভাব পড়বে। যদিও সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা, এই সব বিষয় এখনও মীমাংসিত নয়, তবু সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সুর যে আগের তুলনায় অনেকটাই নরম, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু, ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে চিনা প্রেসিডেন্টের এই বার্তা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে বলেই মত পর্যবেক্ষকদের। ভবিষ্যতে এই সৌহার্দ্য বাস্তব সহযোগিতায় কতটা রূপ নেয়, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Goa murder case, Russian women killed in Goa | টাকার লেনদেন থেকেই কী নৃশংস পরিণতি? গোয়ায় দুই রুশ তরুণী খুনে চাঞ্চল্যকর মোড়, অভিযুক্তের ফোনে মিলল শতাধিক মহিলার ছবি




