সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গোয়া: গোয়ায় দুই রুশ তরুণীর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোয়া পুলিশ (Goa Police) সূত্রে খবর, এই জোড়া খুনের নেপথ্যে টাকার লেনদেনই মূল কারণ হতে পারে বলে জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযুক্ত রুশ নাগরিক আলেক্সেই লিওনভ (Alexey Leonov) -এর সঙ্গে মৃত দুই তরুণী এলিনা ভানিভা (Elena Vaniva) এবং এলিনা কাস্থানোভা-এর (Elena Kastanova) ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই ঘনিষ্ঠতার সূত্রেই বড় অঙ্কের টাকা ধার নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি অভিযুক্তের। কিন্তু সেই টাকা ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করেই সম্পর্কের অবনতি এবং শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি, এমনটাই অনুমান তদন্তকারীদের।
পুলিশ সূত্রে খবর, এই হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত লিওনভ মাদকাসক্ত ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নেশার ঘোরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই কী এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন, নাকি আর্থিক চাপ থেকে রাগের বহিঃপ্রকাশ, এই দুই দিকই সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল। তদন্তে উঠে এসেছে দুই রুশ তরুণীর গোয়ায় আসার সময়কালও। মৃত এলিনা ভানিভা চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি গোয়ায় আসেন। অন্য দিকে, এলিনা কাস্থানোভা গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর থেকেই গোয়ায় ছিলেন। তিনি তখন অভিযুক্ত আলেক্সেই লিওনভের সঙ্গেই একটি বাড়িতে থাকতেন। শুধু গোয়া নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে কাজও করেছেন তাঁরা। কাজের সূত্রেই বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াত ছিল তাঁদের। গোয়া ছিল তাঁদের নিয়মিত আসা-যাওয়ার একটি জায়গা।
আরও পড়ুন : Purba Burdwan : কালনায় সাইবার ক্রাইম সচেতনতা সম্পর্কে বিশেষ সেমিনার
পুলিশ জানিয়েছে, লিওনভ দীর্ঘমেয়াদী ভিসা নিয়ে ভারতে বসবাস করছিলেন। দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি কাজ করতেন। গোয়ায় মাঝেমধ্যেই আসতেন এবং তখনই দুই এলিনার সঙ্গে সময় কাটাতেন। সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। লিওনভের দাবি, এই সময়েই দুই তরুণী তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কেটে গেলেও সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, ‘অভিযুক্তের এই দাবি যাচাই করা হচ্ছে। আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নথি, ব্যাঙ্ক ট্রান্স্যাকশন এবং ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ তবে তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে অভিযুক্তের মোবাইল ফোন থেকে। পুলিশ সূত্রের দাবি, লিওনভের ফোনে একশোরও বেশি মহিলার ছবি উদ্ধার হয়েছে। এই মহিলারা কারা, তাঁদের সঙ্গে অভিযুক্তের কী সম্পর্ক ছিল এবং কেন তাঁদের ছবি মোবাইলে সংরক্ষিত ছিল, এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের অনুমান, এই ছবিগুলি কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, এর পেছনে অন্য কোনও যোগসূত্র থাকতে পারে। মানব পাচার, প্রতারণা বা আর্থিক লেনদেনের কোনও দিক জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে উল্লেখ।
এই দুই রুশ তরুণীর খুনের তদন্ত এগোতেই সামনে এসেছে আরও একটি রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা। অসমের এক মহিলা, মৃদুস্মিতা সইকিয়া-এর (Mridusmita Saikia) মৃত্যুর সঙ্গে অভিযুক্ত লিওনভের যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। গত ১২ জানুয়ারি ঘর থেকে মৃদুস্মিতার দেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাচক্রে, ওই মহিলার সঙ্গেও লিওনভের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের দু’জনকে মাঝেমধ্যেই গোয়ায় একসঙ্গে দেখা গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। শুধু তা-ই নয়, ১১ জানুয়ারিতেও তাঁদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
কিন্তু, প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃদুস্মিতার মৃত্যু অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলেই হয়েছে বলে অনুমান। সেই কারণে এই মুহূর্তে তাঁর মৃত্যুকে খুনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। তবু তিনটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা। এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘একই ব্যক্তির সঙ্গে একাধিক মৃত্যুর যোগ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাই প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
গোয়ার এই জোড়া খুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক স্তরেও আলোড়ন পড়েছে। বিদেশি নাগরিক জড়িত থাকায় তদন্তে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে পুলিশ। রুশ দূতাবাসের (Russian Embassy) সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি, ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (FRRO)-এর সঙ্গেও তথ্য আদানপ্রদান চলছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, গোয়ার মতো পর্যটনপ্রধান রাজ্যে বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা নতুন নয়। তবে আর্থিক লেনদেন, মাদক এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক একসঙ্গে জড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এই ঘটনায় সেই দিকটিই আবার সামনে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে না বলেই মনে করছেন তাঁরা। উল্লেখ্য যে, টাকার লেনদেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, মাদকাসক্তি এবং একাধিক মৃত্যুর যোগসূত্র, এই সব কিছুর জট খুলতে গিয়ে গোয়া পুলিশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ পেলেই স্পষ্ট হবে, এটি নিছক মুহূর্তের রাগের ফল, না কি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনও অপরাধচক্র।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Bihar Gang Rape, Purnia Crime News | অভিযুক্তের মোবাইলেই আর্তনাদ, বিহারে নর্তকী গণধর্ষণ কাণ্ডে শিউরে উঠল পুর্ণিয়া




