অভিজিৎ দত্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালেও বিশ্বের নানা প্রান্তে দিনটি পালন করা হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ, স্বাধীনতা, ন্যায় ও মর্যাদা রক্ষার আহ্বানে। তবে এবারের দিনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ক্রমবর্ধমান সংঘাত, দারিদ্র্য, নারী-শিশু নির্যাতন, মানব পাচার এবং যুদ্ধের অভিঘাত বিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, মানবাধিকার কেবল ধারণা নয়, মানবতার অস্তিত্ব রক্ষার ভিত্তি।
মানবাধিকারকে বলা হয় জন্মগত অধিকার, যা নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে। কিন্তু এই অধিকার প্রতিষ্ঠা কখনওই সহজ ছিল না। বহু শতাব্দী ধরে সংগ্রাম, বিপ্লব, আন্দোলন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আজকের বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামোর জন্ম হয়েছে। দার্শনিক জন লক (John Locke), তিনি মানবাধিকারের ধারণাকে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাঁকে মানবাধিকারের জনক হিসেবেই ধরা হয়। অন্যদিকে ফরাসি আইনবিদ রেনে ক্যাসিন (Rene Cassin) তিনি ১৯৪৮ সালের ‘বিশ্ব মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’-এর প্রধান স্থপতি, তাঁকে বলা হয় মানবাধিকার ঘোষণার জনক। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালনের পটভূমিও এই ঘোষণার মধ্যেই নিহিত। ১৯৪৮ সালের এই দিনে রাষ্ট্রসংঘ (United Nations) গ্রহণ করে Universal Declaration of Human Rights (UDHR) যা বিশ্বব্যাপী মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিপ্রস্তর।
মানবাধিকার বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, জীবনের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, নির্যাতন থেকে মুক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার, ন্যায্য কাজ ও সম্মানজনক জীবিকার অধিকার। সমাজে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করাই এই অধিকারগুলোর মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার এখনও বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ বলছে, নারী ও শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ, মানব পাচার, শিশু শ্রম, গৃহস্থালি সহিংসতা, ধর্ষণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ নানা লঙ্ঘন প্রতিনিয়ত ঘটছে বিশ্বের নানা অঞ্চলে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক, নিকট প্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের কিছু অংশে নির্দোষ মানুষের জীবন প্রতি মুহূর্তে ঝুঁকির মুখে। এ অবস্থায় মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কাঠামো অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৮ সালে ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রসংঘ যেমন বৈশ্বিক মানবাধিকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, তেমনই প্রতিটি দেশে গঠিত হয় বিচারব্যবস্থা, আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকার কমিশন। ভারতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) গঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয় ১৯৯৫ সালে।
মানবাধিকার কমিশনের কাজ বহু বিস্তৃত। প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে-
• ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা
• সামাজিক ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা
• শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা
• উন্নয়ন ও সদ্ভাবনার প্রসার
• আইনের শাসন নিশ্চিত করা
• বিশ্বজনীন মূল্যবোধের বিকাশ
• সামাজিক অগ্রগতি বজায় রাখা
প্রসঙ্গত, মানবাধিকার রক্ষা শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজ নয়। দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ছাড়াও সমাজের প্রতিটি মানুষের। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা শুধু জোর করে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং সচেতনতা, শিক্ষিত জনমত এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারের মাধ্যমেই সম্ভব। দেশ-বিদেশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক দিবস পালনকে আরও অর্থবহ করে তুলছে। শিশু শ্রম, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, গুম, অবৈধ আটক, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য শরণার্থী সংকট, দারিদ্র্য-সবই মানবাধিকার প্রশ্নে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি। ফলে মানবাধিকার আজ আর শুধু আইনি ধারণা নয়- এটি মানব অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘ মহাসচিব প্রায়শই তাঁর বার্তায় বলেন, ‘মানবাধিকার রক্ষা মানেই উন্নয়ন, শান্তি এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা।’ বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও বৈষম্যের এই সময়ে তাঁর এই কথাই যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১০ ডিসেম্বরের এই দিনে তাই বার্তা একটাই, মানবাধিকার রক্ষার লড়াই শেষ হয়নি। তা নতুনভাবে শুরু করতে হবে। সকলের অংশগ্রহণ ছাড়া মানবাধিকার রক্ষা সম্ভব নয়, সচেতন নাগরিক, দায়িত্ববান রাষ্ট্র এবং মানবিক সমাজই পারে একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব গড়তে। এ কারণে আজকের দিনে প্রশ্ন কেবল অতীত স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ। মানবাধিকার রক্ষা কেবল আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তব জীবনে কার্যকর করতে হবে। নারী, শিশু, শ্রমিক, সংখ্যালঘু, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, সবাই যেন নিরাপদ, সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন পায়, এই লক্ষ্যই মানবাধিকার দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও আশার আলো আছে। মানবাধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। যদি সবাই একই লক্ষ্যে এগিয়ে আসে, তবে একদিন মানবাধিকার দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তবের সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠবে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi and PM Benjamin Netanyahu discuss strategic partnership | ভারত-ইসরায়েল কূটনীতিতে নতুন গতি: নরেন্দ্র মোদী–নেতানিয়াহুর আলোচনায় জোর সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও শান্তিপ্রক্রিয়ায় সমর্থন




