সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক,★ কোচবিহার: এনআরসি (NRC) নিয়ে ফের উত্তপ্ত বাংলা-অসম সীমান্তবর্তী জেলাগুলি। আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের বিভিন্ন গ্রামে অসম সরকারের নামে পাঠানো এনআরসি-সংক্রান্ত নোটিস ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বেশ কয়েক মাস ধরেই। সে প্রসঙ্গ আবারও সামনে এনে সোমবার কোচবিহারের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে তীব্র সমালোচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “অসমের কোনও অধিকার নেই বাংলার মানুষকে চিঠি পাঠানোর। অন্য রাজ্য থেকে এসে কেউ যাতে বাংলার নিরীহ মানুষকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে কড়া নজরদারি করতে হবে।” প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত জেলা-উর্ধ্বতন আধিকারিকদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশ, “নমঃশূদ্র এবং রাজবংশী সহ সমস্ত মানুষকে বলছি, বাংলায় ডিটেনশন ক্যাম্প আমি থাকতে দেব না। এখানে কেউ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে না, এটা আমি হতে দেব না।” তাঁর কথায়, রাজ্যের স্বাভাবিক শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা হলে বা অন্য রাজ্যের প্রশাসন অনুমতি ছাড়া বাংলার নাগরিকদের ভয় দেখালে, সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সম্প্রতি আলিপুরদুয়ারের জটেশ্বর এলাকার এক গৃহবধূর কাছে এনআরসি’র নোটিস পৌঁছয় বলে অভিযোগ। তার আগেও কোচবিহারের কয়েকটি গ্রামে একই ধরনের নোটিস নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়ায়। যদিও অসম সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয়দের দাবি, বাহিরের কিছু লোক তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাগজ দেখাতে বলছিল এবং অসমের এনআরসি নোটিস ধরিয়ে দিচ্ছিল। এই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে অবশ্যই রাজ্য সরকার সহযোগিতা করবে। কিন্তু অপরাধী আর সাধারণ নাগরিক কখনও এক নয়। শুধু কারও নামে কেউ কিছু বললেই সে অপরাধী হয়ে যায় না। এভাবে ভয় দেখানো চলবে না।” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) আরও বলেন, “কেউ যদি বাংলার মানুষকে ভয় দেখাতে আসে, বা গ্রেফতার করতে আসে, আগে রাজ্যের সঙ্গে কথা বলতে হবে। না হলে অন্য রাজ্যের পুলিশ বাংলায় ঢুকে সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে যাবে, এটা চলতে পারে না। রাজ্যবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সম্প্রতি এনআরসি প্রসঙ্গ আবারও জাতীয়পরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য সেই উদ্বেগই প্রশমিত করার চেষ্টা বলে মনে করছে প্রশাসনের একাংশ।অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury) আগেই বলেছেন, “এনআরসির মতো বিষয় মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তাই গ্রামেগঞ্জে এ নিয়ে অযথা আতঙ্ক ছড়ানো উচিত নয়।” যদিও এদিনের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিশানা না করলেও তাঁর বার্তা যে অত্যন্ত দৃঢ় এবং প্রতিরোধী, তা স্পষ্ট।প্রশাসনিক মহল মনে করছে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ভবিষ্যতে আবারও কোনও এনআরসি-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে পুলিশকে আগের থেকে আরও সতর্ক থাকতে হবে, এটাই মূলত মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা। এর পাশাপাশি, সভায় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যের মানুষ যাতে ভরসা হারিয়ে না ফেলেন এবং কোনও ভুয়ো নোটিস বা গুজবে প্রভাবিত না হন, প্রশাসনকে তৎপর হতে হবে। তিনি আরও বলেন, “মানুষ আগে নিরাপদ বোধ করলে তবেই উন্নয়ন সম্ভব। ভয় দেখিয়ে প্রশাসন চালানো যায় না। তাই সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।”
এনআরসি নিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ব্লকে ইতিমধ্যেই সচেতনতা প্রচার শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অসম বা অন্য কোনও রাজ্য থেকে যদি কেউ বাংলার বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি জমা দিতে বলে, সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানা ও বিডিও অফিসকে জানাতে হবে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এনআরসি প্রসঙ্গ আবার সামনে আসায় উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের উদ্বেগ অনেকটাই কমিয়ে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee Claims: ‘BJP Planned President’s Rule If SIR Was Blocked |অমিত শাহের ‘চালাকি’ ভেস্তে দিল তৃণমূল? বহরমপুরে মমতার বিস্ফোরক দাবি, ‘এসআইআর আটকে দিলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করত বিজেপি’




