সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ গুয়াহাটি : অসমের রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহলে সোমবার ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একই দিনে সামাজিক মাধ্যমে পরপর দু’টি পোস্ট করে একদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা দিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma), অন্যদিকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে এক যুবকের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই দুই বক্তব্য ঘিরে রাজ্যজুড়ে যেমন আলোচনা শুরু হয়েছে, তেমনই জাতীয় স্তরেও তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চর্চা।
সোমবার প্রথম পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘মন্দির, নামঘর প্রভৃতি উপাসনাস্থল আমাদের জাতির প্রাণ’। অসমের সামাজিক জীবনে নামঘর ও সত্রের ভূমিকা যে কতটা গভীর, তা আবারও তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, এই উপাসনাস্থলগুলির পরিচর্যা ও সুরক্ষাকে তাঁর সরকার সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছে। নামঘর ও সত্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নেওয়া বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপের কথাও তিনি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) জানান, তাঁর সরকারের আমলে অসমে মন্দির ও নামঘরের জন্য মোট ৪৩৩.৬৭ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্যও এই খাতে ৩২৫.৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলে তিনি স্পষ্ট করেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই তথ্য সামনে আসার পরেই রাজ্যের ধর্মীয় সংগঠন, সত্রাধিকাৰ এবং নামঘর পরিচালন কমিটিগুলির মধ্যে স্বস্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘এই বরাদ্দ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং অসমের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রক্ষার স্বীকৃতি’। উল্লেখ্য যে, অসমের ইতিহাসে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব (Srimanta Sankardeva) প্রবর্তিত নামঘর ও সত্র ব্যবস্থার সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক চর্চা, ধর্মীয় সমবায় এবং সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু এই নামঘরগুলি। মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টে সেই ঐতিহ্যকেই রাজনৈতিক স্তরে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের।
একই দিনে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বিতীয় পোস্টে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে এক যুবকের নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma)। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, ‘বাংলাদেশে নির্মমভাবে গণহত্যার শিকার হওয়া যুবকটির বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। এই মন্তব্যের পরেই বিষয়টি শুধুমাত্র মানবাধিকার নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচিত হতে শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশি নাগরিকদের অনুপ্রবেশের বিষয়টি অসমের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সংবেদনশীল ‘চিকেন নেক’ করিডর নিয়ে বিজেপি সরকারের অবস্থান যে বরাবরই কঠোর, সেটাও স্পষ্ট করে দেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘জাতি, মাটি ও ভিটির প্রশ্নে বিজেপি সরকার কখনও আপস করেনি’। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সীমান্ত সুরক্ষা, অন্যদিকে তেমনই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই দুই পোস্ট আসলে একই সূত্রে বাঁধা। একদিকে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার বার্তা, অন্যদিকে সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন, এই দুই ইস্যুই বর্তমানে অসম রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। বিরোধী দলগুলির একাংশ দাবি করেছে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিজেপি আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে। যদিও শাসক দলের নেতারা বলছেন, ‘এটা রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন’। অসমের সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই পোস্টগুলি নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। নামঘর ও সত্রের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণায় খুশি বহু গ্রামীণ মানুষ। আবার সীমান্ত সংক্রান্ত বক্তব্যে অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিনের সমস্যাকে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই দুই পোস্ট ইতিমধ্যেই হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া ও শেয়ার পেয়েছে।
রাজনৈতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, অসমের মতো সীমান্তবর্তী ও বহু-সংস্কৃতির রাজ্যে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা, দুই বিষয়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) সেই বাস্তবতাকেই রাজনৈতিক ভাষায় তুলে ধরেছেন। আগামী দিনে এই দুই ইস্যু কীভাবে নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল। উল্লেখ্য যে, একদিনে মুখ্যমন্ত্রীর এই দুই বার্তা শুধু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টেই সীমাবদ্ধ নেই। এগুলি অসমের বর্তমান রাজনৈতিক দিশা, সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভাবনার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam government jobs update, CM Himanta Biswa Sarma statement | অসম ক্যাবিনেটের একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে উন্নয়নের গতি, ১ লক্ষ ৪২ হাজার ছাড়াল সরকারি নিয়োগ, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বার্তা



