নবারুণ দাস ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার (Divorce Rate) একে অপরের থেকে বিস্ময়করভাবে আলাদা। কোথাও সম্পর্ক ভাঙন সাংস্কৃতিকভাবে অপছন্দনীয়, কোথাও আবার সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বিবাহ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট, ভারত থেকে শুরু করে ইউরোপের বহু দেশ পর্যন্ত বিচ্ছেদের হার ক্রমাগত বাড়ছে, আবার কিছু দেশে তা আশ্চর্যজনকভাবে নিম্নমুখী। এই বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, লিঙ্গ সমতা, শিক্ষার বিস্তার এবং জীবনযাপনের দ্রুত পরিবর্তন।
ভারতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার মাত্র ১%, যা বিশ্বের সবচেয়ে কম হারগুলোর অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় সমাজে পরিবারকে কেন্দ্র করে যে সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা দাম্পত্য সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। সমাজবিজ্ঞানী ড. রাহুল কুমার (Dr. Rahul Kumar) বলেন, “ভারতের মতো দেশে বিবাহ শুধুই দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়; এটি দুই পরিবারের বন্ধন। তাই বিচ্ছেদকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়।” এর ঠিক বিপরীতে রয়েছে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমানাধিকারের চর্চা এবং জীবনযাত্রার দ্রুত পরিবর্তন বিবাহ বিচ্ছেদের হারকে তুলনামূলকভাবে বাড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্পেন (Spain)-এ হার ৮৫%, লাক্সেমবার্গ (Luxembourg)-এ ৭৯%, আর পর্তুগাল (Portugal) -এ আশ্চর্যজনকভাবে ৯৪%, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ বিবাহ বিচ্ছেদ হার হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান বলছে, এশিয়ার দেশগুলোতে বিচ্ছেদ হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ভিয়েতনামে (Vietnam) ৭%, তাজিকিস্তানে (Tajikistan) ১০%, ইরানে (Iran) ১৪%, আর চীনে (China) এর হার ৪৪%। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, স্বাধীনতা, নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক চাপের কমে যাওয়া এসব দেশে বিচ্ছেদ হার বাড়ার মূল কারণ। যুক্তরাষ্ট্র-এ (United States) বিবাহ বিচ্ছেদের হার ৪৫%, যা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। মার্কিন সমাজ বিশেষজ্ঞ লিসা জনসন (Lisa Johnson) বলেন, “আমেরিকায় ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। তাই সম্পর্কের মাঝে মানসিক অশান্তি দেখা দিলে দম্পতিরা বিচ্ছেদকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেন।”
ইউরোপের দেশ সুইডেনে বিবাহ বিচ্ছেদের (Sweden) হার ৫০%, ফ্রান্স (France) -এ ৫১%, বেলজিয়াম (Belgium)-এ ৫৩%, আর ফিনল্যান্ড (Finland)-এ ৫৫%। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশে বিচ্ছেদকে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে দাম্পত্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সম্পর্কের ইতি টানতে দ্বিধা থাকে না।
রাশিয়াতে (Russia) বিচ্ছেদের হার ৭৩%, ইউক্রেনে (Ukraine) ৭০%। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এই উচ্চ হারের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। লাতিন আমেরিকার দেশ যেমন ব্রাজিলে (Brazil) ২১%, কলম্বিয়াতে (Colombia) ৩০% , এবং কিউবাতে (Cuba) ৫৫%। এসব অঞ্চলে গত কয়েক দশকে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিচ্ছেদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।আফ্রিকার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাতেও (South Africa) বিচ্ছেদ হার ১৭%, যা অন্যান্য আফ্রিকান দেশের তুলনায় তুলনামূলক বেশি। স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন, কর্মসংস্থান সংকট, এবং পারিবারিক নির্ভরতা কমে যাওয়ার ফলে এমনটা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়াতে (Australia) হার ৪৩%, নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) হার ৪১%, এবং কানাডার (Canada) ৪৭%। এসব দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মানসিক সুস্থতার প্রতি সচেতনতা যত বাড়ছে, বিচ্ছেদের হারও তত উপরের দিকে উঠছে।
তুরস্ক (Turkey)–এর হার ২৫%, পোল্যান্ড (Poland) -এর ৩৩%, জাপান (Japan) -এর ৩৫%, জার্মানির (Germany) ৩৮%, আর যুক্তরাজ্যর (United Kingdom) ৪১%। এই সংখ্যাগুলো সমাজে চলমান পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। এই বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান আমাদের সামনে তুলে ধরে, বিবাহের ধারণা বিভিন্ন দেশে ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও বিচ্ছেদ এখনও নিষিদ্ধ, আবার কোথাও এটি ব্যক্তিগত সুখ অনুসন্ধানের একটি বাস্তবিক সিদ্ধান্ত। ভবিষ্যতে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং লিঙ্গ সমতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বিশ্বজুড়ে আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Barack Obama Chicago | শিকাগোর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে ওবামা: ‘কমিউনিটির প্রাণ এ-ই ব্যবসাগুল



