সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ডিব্রুগড়: অসমের ঐতিহ্যবাহী গয়ন-বায়ন সঙ্গীত সংস্কৃতি শান্তি, শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক শক্তির ধারা, এমনই মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহণ ও জলপথ মন্ত্রী সার্বানন্দ সোনোয়াল (Sarbananda Sonowal)। ডিব্রুগড় জেলার রাজগড়ে আয়োজিত ‘মৃদঙ্গীয়া গয়ন-বায়ন সংস্থা, অসম’ (Mridangiya Gayan-Bayan Sanstha, Assam) -এর দ্বিতীয় দ্বিবার্ষিক পূর্ণাঙ্গ রাজ্য সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
শ্রী শ্রী আউনিয়াটি সত্ৰ (Sri Sri Auniati Satra) -এর উদ্যোগে দিনব্যাপী অখণ্ড ভাগবত পাঠ ও আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত বক্তৃতায় সার্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ‘মৃদঙ্গীয়া গয়ন-বায়ন অসমের সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দীর্ঘদিনের সাধনা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই ঐতিহ্য আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তরুণ প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে অনুপ্রাণিত করেছে।’ তিনি আরও বলেন যে, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সময়ে সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর কথায়, ‘আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমাদের প্রাচীন শিল্প ও আধ্যাত্মিক চর্চা সমাজকে ভারসাম্য ও মানসিক স্থিতি প্রদান করে। গয়ন-বায়নের মতো ঐতিহ্য আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘মৃদঙ্গীয়া গয়ন-বায়ন সংস্থার মতো সংগঠনগুলি প্রশিক্ষণ, পরিবেশন ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছে। এর ফলে অসমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার শুধু টিকে থাকেনি, বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে।’ নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সার্বানন্দ সোনোয়াল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আজ এই বিশাল সাংস্কৃতিক ক্যানভাস নিজ চোখে দেখে আমি সত্যিই আপ্লুত। আমি গ্রামবাংলার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই নামঘরে খোল ও মৃদঙ্গের ধ্বণিতে বড় হয়েছি। মৃদঙ্গ প্রাচীন ভারতের অন্যতম পবিত্র বাদ্যযন্ত্র। পুরাণকথায় একে ‘দিব্য বাদ্যযন্ত্র’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বাদ্যযন্ত্রের কোনও লিখিত শাস্ত্র বা পাঠ্য নেই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটি স্বতন্ত্র ধারা ও শৈলীর মাধ্যমে এটি বিকশিত হয়েছে। অসমের বিভিন্ন গ্রামের ছড়িয়ে থাকা গয়ন-বায়ন ধারাকে এক মঞ্চে নিয়ে আসা গর্ব ও তৃপ্তির বিষয়। এই আয়োজন সফল করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল বিশিষ্ট বায়ন শিল্পী বানশী বাকলিয়ালকে (Banshi Bakliyal) সম্মাননা প্রদান। ডিব্রুগড় জেলার কামারচুক গ্রামের এই শিল্পী কয়েক দশক ধরে মৃদঙ্গীয়া গয়ন-বায়ন চর্চা, প্রশিক্ষণ ও পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সার্বানন্দ সোনোয়াল তাঁকে সম্মানিত করেন এবং বলেন, ‘এই ধরনের শিল্পীরাই আমাদের ঐতিহ্যের প্রকৃত ধারক ও বাহক।’
সম্মেলনে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অসম সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী বিমল বড়া (Bimal Bora), রাজ্যসভা সাংসদ রামেশ্বর তেলি (Rameswar Teli), আউনিয়াটি সত্ৰের সত্ৰাধিকার শ্রী শ্রী পীতাম্বর দেব গোস্বামী (Sri Sri Pitambar Dev Goswami), অসম পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিকুল ডেকা (Bikul Deka) সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক সাধক ও সাধারণ মানুষ। বক্তারা সকলেই একবাক্যে বলেন যে, গয়ন-বায়নের মতো লোকায়ত ও শাস্ত্রীয় শিল্পধারা অসমের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে কেবল অতীতকে আগলে রাখা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক শক্তির ভিত মজবুত করা। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হল যে, অসমের গয়ন-বায়ন শুধু সংগীত বা নৃত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক আন্দোলন। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও এই ঐতিহ্য মানুষের মনে শান্তি, ঐক্য ও নৈতিক শক্তির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। সার্বানন্দ সোনোয়ালের আহ্বান অনুযায়ী, এই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ ও বিকাশে সমাজের সকল স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mukhyamantri Mahila Udyamita Abhiyan, Himanta Biswa Sarma | বজালীতে নারীর ক্ষমতায়নের নতুন অধ্যায়, ২৮ হাজারের বেশি উপভোক্তাকে চেক প্রদান শুরু করলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা




