প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : গত সোমবার, ৫ জানুয়ারি ৪০ বছরে পা দিলেন দীপিকা পাড়ুকোন (Deepika Padukone)। বলিউডের গ্ল্যামার জগতের বাইরে গিয়েও ক্রমশ হয়ে উঠেছেন একজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আইকন। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভিনয় জীবনে একের পর এক বাণিজ্যিক সাফল্য যেমন তাঁর ঝুলিতে এসেছে, তেমনই এসেছে সাহসী অবস্থান, স্পষ্ট মতামত এবং সমাজের নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে নির্ভীক কণ্ঠস্বর। জন্মদিনের দিনে ফিরে তাকালে পরিষ্কার হয়, দীপিকার সফর এক আত্মবিশ্বাসী নারীর নিজের শর্তে পথ চলা।

২০০৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। মার্জার সরণি থেকে শুরু হওয়া যাত্রা প্রথমে বিজ্ঞাপন ও মিউজ়িক ভিডিয়োতে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ২০০৭ সালে ‘ওম শান্তি ওম’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে তাঁর অভিষেক হয়। বলিউডের বাদশা শাহরুখ খান (Shah Rukh Khan) -এর বিপরীতে শান্তিপ্রিয়া চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি রাতারাতি দর্শকের নজর কেড়ে নেয়।

প্রথম ছবিতেই সাফল্যের স্বাদ পেয়ে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।পরবর্তী সময়ে ‘লাভ আজ কাল’, ‘পিকু’, ‘বাজিরাও মস্তানি’, ‘পদ্মাবত’, ‘ছপক’-এর মতো নানা ঘরানার ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে প্রমাণ করেছেন দীপিকা। চরিত্র বাছাইয়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং অভিনয়ে সংযমী গভীরতা তাঁকে সমসাময়িক অভিনেত্রীদের ভিড় থেকে আলাদা করেছে। তবে অভিনয়ের বাইরেও তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে।
২০১৫ সালে নিজের অবসাদগ্রস্ততা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন দীপিকা পাড়ুকোন। সেই সময় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা বলিউডে খুব একটা প্রচলিত ছিল না। ‘মানসিক অসুস্থতা অন্য যে কোনও শারীরিক অসুখের মতোই’, এই বার্তা তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। তাঁর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘লিভ লাভ লাফ’ (Live Love Laugh) এখন মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অবসাদে ভোগা বহু মানুষের কাছে ভরসার জায়গা। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়ে অকপটে কথা বলে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন দীপিকা।বলিউডে নারী-পুরুষের পারিশ্রমিক বৈষম্য নিয়েও একাধিকবার তিনি সরব হয়েছেন। পুরুষ অভিনেতাদের তুলনায় কম পারিশ্রমিকের প্রস্তাব পেলে, বড় ব্যানারের ছবি হলেও সরে দাঁড়াতে দ্বিধা করেননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ‘আমি আমার কাজের রেকর্ড জানি, তাই আমার মূল্য কত হওয়া উচিত, সেটাও জানি।’ এই অবস্থান বহু তরুণ অভিনেত্রীকে নিজেদের প্রাপ্য দাবি করতে সাহস জুগিয়েছে।

কর্মজীবনের ভারসাম্য নিয়েও আপসহীন দীপিকা। দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করবেন না, এই শর্তে অনড় থাকায় সন্দীপ রেড্ডী বাঙ্গা (Sandeep Reddy Vanga)-র ছবি ‘স্পিরিট’ থেকে তাঁকে বাদ পড়তে হয়। তথাপি, নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন। এই পদক্ষেপ বিনোদন জগতে কাজের সময়সীমা ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বার্তাও বহন করেছেন দীপিকা পাড়ুকোন। আবু ধাবির বিজ্ঞাপনে গ্র্যান্ড মসজিদে হিজাব পরে উপস্থিত হওয়া কিংবা কান চলচ্চিত্র উৎসবে শাড়িতে ধরা দেওয়া, এই দুই দৃশ্যই তাঁর বিশ্বনাগরিক সত্তার প্রকাশ। স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখিয়েই আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে তিনি নিজের ভূমিকা পালন করেছেন। নারী-পুরুষের সমানাধিকার এবং নারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার নিয়েও ধারাবাহিক ভাবে কথা বলেছেন দীপিকা। নারীর শরীর, পোশাক ও জীবনধারা নিয়ে দীপিকা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। সেই ভাবনা থেকেই ‘ছপক’ -এর মতো সামাজিক বার্তাবহ ছবি বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে অ্যাসিড হামলার শিকার এক নারীর লড়াই তুলে ধরা হয়।

২০২০ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (Jawaharlal Nehru University) -এ এনআরসি ও সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে নীরব প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। কোনও বক্তব্য না রেখেও তাঁর উপস্থিতি প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে রেখেছিলেন ।
উল্লেখ্য, ৪০ বছরে পা দিয়ে দীপিকা পাড়ুকোন ভারতীয় সিনেমা সংস্কৃতিতে একটি ভাবনা, একটি বড় অবস্থান। অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিকতার প্রশ্নে তাঁর নির্ভীক ভূমিকা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত করেছে। বয়স বাড়লেও দীপিকার প্রভাব যে আরও বিস্তৃত হবে, তা বলাই যায়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Deepika Padukone Sanjay Leela Bhansali | রণবীরকে নয়, এক সময় বিয়ের পছন্দে পরিচালক! দীপিকার পুরনো মন্তব্য ঘিরে ফের চর্চা




