সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ সিউড়ি : পারিবারিক অশান্তি, নেশাগ্রস্ততার দাপট আর তার পরিণতিতে চরম নৃশংসতা, এই তিনের মিশেলেই ফের রক্তাক্ত হল গ্রামীণ বাংলা। বীরভূম (Birbhum) জেলার নলহাটি (Nalhati) এলাকায় ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় স্তম্ভিত গোটা এলাকা। অভিযোগ, দুই নাবালক সন্তানের সামনে স্ত্রী রূপালি লেটের (Rupali Let) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন তাঁর স্বামী দীপঙ্কর লেট (Dipankar Let)। সোমবার গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনাটি সামনে আসতেই গ্রামজুড়ে ক্ষোভ ও আতঙ্কের আবহ তৈরি হয়েছে।স্থানীয় সূত্রে খবর, দীপঙ্কর লেট দীর্ঘদিন ধরেই নেশায় আসক্ত। প্রতিদিনই আকণ্ঠ মদ্যপান করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরতেন তিনি। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রায়শই স্ত্রী রূপালির সঙ্গে অশান্তি করতেন বলে অভিযোগ। পারিবারিক কলহ তাঁদের জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। সোমবার রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন রাতে মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে দীপঙ্কর স্ত্রীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন।
রাত তখন গভীর। বাড়ির এক কোণে দুই নাবালক সন্তানকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন রূপালি লেট। হঠাৎই ঝগড়া চরমে ওঠে। অভিযোগ, আচমকাই রূপালির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন দীপঙ্কর। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনে ঝলসে যান গৃহবধূ। মায়ের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় দুই শিশুর। সন্তানদের সামনে এই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে পড়েন প্রতিবেশীরাও। রূপালির আর্তনাদ শুনে ছুটে আসেন আশপাশের বাসিন্দারা। তাঁরা কোনও রকমে আগুন নেভান এবং দগ্ধ অবস্থায় রূপালিকে উদ্ধার করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নলহাটি ব্লক হাসপাতালে (Nalhati Block Hospital) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে দ্রুত রামপুরহাট সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (Rampurhat Government Medical College and Hospital) স্থানান্তর করেন। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন রূপালি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর শরীরের একটি বড় অংশ আগুনে পুড়ে গিয়েছে এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক।
অন্য দিকে, ঘটনার খবর পেয়ে তৎপর হয় নলহাটি থানার (Nalhati Police Station) পুলিশ। অভিযুক্ত স্বামী দীপঙ্কর লেটকে আটক করা হয়েছে। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বধূর বাপের বাড়ির লোকজন নলহাটি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রূপালি লেট পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরেই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একাধিকবার তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। সোমবার রাতে সেই হুমকিই বাস্তব রূপ নেয়। নিজের দুই সন্তানের সামনে এমন পাশবিক আচরণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন রূপালি।
এই ঘটনায় নতুন করে উঠে এসেছে গৃহহিংসা ও নেশাজনিত অপরাধের ভয়াবহ চিত্র। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, দীপঙ্করের নেশার অভ্যাস দীর্ঘদিনের হলেও বিষয়টি কখনও প্রশাসনের নজরে আসেনি। যদি আগে থেকেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হত, তবে হয়তো এমন মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত। গ্রামের বহু মানুষ এই ঘটনার পর দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। সমাজকর্মীদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় গৃহহিংসার ঘটনা এখনও বহু ক্ষেত্রে চাপা পড়ে যায়। সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে অনেক নারীই মুখ খুলতে পারেন না। রূপালির ঘটনায় সেই চিরাচরিত ছবিটাই যেন আবার সামনে এল। দুই নাবালক সন্তানের মানসিক অবস্থাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে মায়ের উপর এমন নৃশংস হামলার স্মৃতি তাদের জীবনে দীর্ঘদিনের ক্ষত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন মনোবিদেরা। উল্লেখ্য যে, এই ঘটনার পর বীরভূম জুড়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নেশামুক্তি অভিযান, গৃহহিংসারোধে সচেতনতা এবং দ্রুত আইনি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা ফের একবার সামনে এসেছে। আপাতত সকলের নজর রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন রূপালি লেটের শারীরিক অবস্থার দিকে। পাশাপাশি, আইনের হাতে অভিযুক্ত দীপঙ্কর লেট কী শাস্তি পান, সেদিকেও তাকিয়ে গোটা এলাকা।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : West Bengal cold wave | দক্ষিণবঙ্গে হাড়কাঁপানো শীতের দাপট, কুয়াশার চাদরে শহর-গ্রাম, তাপমাত্রায় টেক্কা পাহাড়কেও




