সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের শক্তি নিরাপত্তা, শিল্পোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কয়লা যে এখনও এক অপরিহার্য স্তম্ভ, তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রকের (Coal Ministry) দুই দিনের চিন্তন শিবির। পাঁচ ও ছয় জানুয়ারি ২০২৬, হরিয়ানার গুরুগ্রামের মানেসরে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের কয়লা খাতের অগ্রগতি পর্যালোচনা, চলমান সংস্কারের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে বিস্তৃত আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি মন্ত্রী শ্রী জি. কিষান রেড্ডির (G. Kishan Reddy) সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি প্রতিমন্ত্রী শ্রী সতীশ চন্দ্র দুবে (Satish Chandra Dubey) সহ-সভাপতিত্বে আয়োজিত এই শিবিরে উপস্থিত ছিলেন কয়লা মন্ত্রকের সচিব শ্রী বিক্রম দেব দত্ত (Vikram Dev Dutt), অতিরিক্ত সচিব শ্রীমতী রূপিন্দর বরার (Rupinder Brar), শ্রী সনোজ কুমার ঝা (Sanoj Kumar Jha), কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড (Coal India Limited) -এর চেয়ারম্যান, সমস্ত কয়লা ও লিগনাইট পিএসইউ-র সিএমডি এবং শীর্ষ আধিকারিকেরা।
এই চিন্তন শিবিরকে কেবল প্রশাসনিক বৈঠকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে, কয়লা ইকোসিস্টেমের নেতৃত্বকে সংস্কার, কর্মদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর নিয়ে ফলাফলমুখী ভাবনাচিন্তার সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে একটি দূরদর্শী রোডম্যাপ তৈরিই ছিল মূল লক্ষ্য। নিজের ভাষণে শ্রী জি. কিষান রেড্ডি স্পষ্ট করে বলেন, ‘স্বচ্ছ শক্তির দিকে দেশ এগোলেও কয়লা এখনও ভারতের শক্তি নিরাপত্তার মেরুদণ্ড’। তাঁর মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের ভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশে কয়লার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত ১,০৪৭ মিলিয়ন টনের বেশি কয়লা উৎপাদন করে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়েছে, যা সক্ষমতা বৃদ্ধি, অপারেশনাল দক্ষতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে উন্নত সমন্বয়ের ফল। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কয়লা খাতের সংস্কার হতে হবে একরূপতা ও মানদণ্ডভিত্তিক, যাতে সমস্ত পিএসইউ-তে একই ধরনের কাজের পদ্ধতি ও পূর্বানুমানযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত হয়। যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ ব্যবহার, সম্পদ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অপারেশনাল অদক্ষতা কমাতে সময়বদ্ধ পরিকল্পনার আহ্বান জানান তিনি। নিরাপত্তাকে ‘অ-আলোচনাযোগ্য’ উল্লেখ করে শূন্য দুর্ঘটনার লক্ষ্যে কড়া নিরাপত্তা মানদণ্ড, নজরদারি ও জবাবদিহির কথা তুলে ধরেন।
শুধু উৎপাদন নয়, কয়লা উৎপাদনকারী অঞ্চলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকা সহায়তার মতো সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচি আরও গভীর করার কথাও বলেন শ্রী রেড্ডি। পাশাপাশি, পরিকল্পিত বনসৃজন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে খনন কার্যক্রমে টেকসই পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন ও উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থার ফলে কয়লা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে ঘরোয়া চাহিদা মিটিয়ে নির্বাচিতভাবে কয়লা রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে বলে তিনি জানান। প্রতিমন্ত্রী শ্রী সতীশ চন্দ্র দুবে বলেন, এই চিন্তন শিবির দীর্ঘমেয়াদি, ফলাফলভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রতি মন্ত্রকের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি কয়লার গুণগত মান উন্নয়নে ওয়াশারি সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিটি খনি ব্লকের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক নিয়োগ এবং ফার্স্ট মাইল কানেক্টিভিটি (FMC) প্রকল্পে গতি আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দ্রুত যান্ত্রিকীকরণ ও নিরবচ্ছিন্ন কয়লা পরিবহণই প্রতিযোগিতামূলক শক্তি বাড়ানোর চাবিকাঠি।
কয়লা মন্ত্রকের সচিব শ্রী বিক্রম দেব দত্ত তাঁর সূচনাভাষণে বলেন, নীতিগত স্পষ্টতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ইতিমধ্যেই সম্পন্ন, এখন মূল লক্ষ্য হতে হবে দ্রুত বাস্তবায়ন ও পরিমাপযোগ্য ফল। তিনি স্পষ্ট জানান, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন হবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দৃশ্যমান ফলাফলের ভিত্তিতে। প্রযুক্তি গ্রহণকে ‘অপরিহার্য’ উল্লেখ করে ডিজিটাল সিস্টেম, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও এআই-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কয়লা ভ্যালু চেইনের মানক প্রক্রিয়া করার নির্দেশ দেন তিনি। উল্লেখ্য, চিন্তন শিবিরে একাধিক বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন হয়। কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান শ্রী বি. সাইরাম (B. Sairam)-এর নেতৃত্বে ‘সংস্কার পরিকল্পনা’ বিষয়ক অধিবেশনে গ্রাহককেন্দ্রিক জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি, এআই-ভিত্তিক টেন্ডার মূল্যায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর ও গবেষণা ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো দিক উঠে আসে। পাশাপাশি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা, দ্রুত খনি চালু, কয়লার গুণমান উন্নয়ন, ভূগর্ভস্থ খনন ও বাণিজ্যিক খননের প্রতিযোগিতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
এই শিবির চলাকালীন শ্রী জি. কিষান রেড্ডি রাঁচির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কোল ম্যানেজমেন্ট-এ (IICM) নবনির্মিত এক্সিকিউটিভ হস্টেলের উদ্বোধন করেন, যা কয়লা খাতে দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বস্তুত, এই চিন্তন শিবির স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, আলোচনা নয়, এখন সময় দ্রুত ও সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের। ২০৪৭-এর ‘বিকশিত ভারত’ লক্ষ্যে এগোতে কয়লা খাত যে আত্মনির্ভরতা, শক্তি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে, তা এই বৈঠকেই পরিষ্কার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Coal Smuggling Case : পাচারের আগে কয়লা ও বাইক উদ্ধার করলেন পুলিশ




