প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : বলিউডের ঝলমলে আলো আর বিদেশে বিলাসবহুল সংসারের ছবিতে অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি যেন নিখুঁত রূপকথার জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু সেই ঝলকের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা, মানসিক ভাঙন এবং গার্হস্থ্য হিংসার অভিযোগ। সম্প্রতি অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি (Celina Jaitly) সমাজমাধ্যমে নিজের জীবনের সেই অন্ধকার কথা প্রকাশ্যে এনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন। তাঁর দাবি, প্রায় ১৫ বছরের বিবাহিত জীবনে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে সন্তানদের হেফাজত নিয়ে আইনি লড়াইয়ের মধ্যেও দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে। উল্লেখ্য, এক সময় বলিউডের পরিচিত মুখ সেলিনা জেটলি হঠাৎই চলচ্চিত্র জগৎ থেকে দূরে সরে গিয়ে সংসার ও পরিবারকে প্রাধান্য দেন। ২০১০ সালে অস্ট্রিয়ার হোটেল ব্যবসায়ী পিটার হাগকে (Peter Haag) বিয়ে করার পর তিনি বিদেশেই বসবাস শুরু করেন। ভক্তদের কাছে সেই জীবন ছিল ঈর্ষণীয়, সুন্দর পরিবার, সন্তান, বিদেশের জীবনযাপন। কিন্তু অভিনেত্রীর কথায়, বাস্তবের গল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে সেলিনা জানান, গার্হস্থ্য হিংসা কখনও হঠাৎ করে শুরু হয় না। শুরুটা অনেক সময় খুব কোমল ও আকর্ষণীয় পরিবেশের মধ্যেই ঘটে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রথমে থাকে ভালবাসা, প্রতিশ্রুতি আর নির্ভরতার আবহ। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কের ভিতরেই তৈরি হয় নিয়ন্ত্রণ আর মানসিক চাপের পরিবেশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আঘাতের পর যখন ক্ষমা চাওয়া হয়, তখন মনে হয় সব আবার ঠিক হয়ে যাবে। এই আশাটাই অনেক সময় মানুষকে সম্পর্কের মধ্যে আটকে রাখে।’ অভিনেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে থাকতে তাঁর আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘প্রথমবার কেউ আঘাত করলে মানুষ হতবাক হয়ে যায়। একই ঘটনা বারবার ঘটলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। আর যখন সেই ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়, তখন অনেকেই সেটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে।’ তাঁর মতে, সমাজে বিবাহকে অত্যন্ত পবিত্র সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে বহু নারী মনে করেন তাঁরা ভালবাসা ও সহনশীলতার মাধ্যমে সব সমস্যা ঠিক করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব সব সময় সেই আশা পূরণ করে না।
গত বছরের নভেম্বর মাসে সেলিনা জেটলি মুম্বাইয়ের আন্ধেরি আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামী পিটার হাগ তাঁকে না জানিয়েই ভিয়েনায় থাকা সম্পত্তি বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন। বিষয়টি জানতে পারার পরই তিনি আইনি পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেন। অভিনেত্রীর আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিচ্ছেদের মামলায় সেলিনা তাঁর তিন সন্তানের পূর্ণ হেফাজত চেয়েছেন। বর্তমানে সন্তানরা অস্ট্রিয়ায় তাঁদের বাবার সঙ্গেই রয়েছে। এই পরিস্থিতি অভিনেত্রীর জন্য অত্যন্ত মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানদের থেকে দূরে থাকা তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলির একটি বলে তিনি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, মামলায় সেলিনা জেটলি মাসিক প্রায় ১০ লক্ষ টাকা খোরপোশ দাবি করেছেন। পাশাপাশি তাঁর কেরিয়ারের ক্ষতির জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও চাওয়া হয়েছে। অভিনেত্রীর দাবি, বিয়ের পর তিনি সম্পূর্ণভাবে পরিবার ও সন্তানদের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। ফলে তাঁর অভিনয়জীবন থমকে যায় এবং সেই সিদ্ধান্তের কারণে আর্থিক ও পেশাগতভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। আইনি লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, পিটার হাগ অস্ট্রিয়ার আদালতেও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন যাতে বিচ্ছেদের পর সেলিনা কোনও খোরপোশ না পান। ফলে এই মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার মধ্যেও পড়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
শুধু ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কথা বলতেই তিনি মুখ খোলেননি। সেলিনা জেটলির মতে, তাঁর অভিজ্ঞতা অন্য অনেক নারীর জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এই অবস্থায় পৌঁছনোর আগেই নারীদের সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। নীরবতা অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।’ প্রসঙ্গ, গার্হস্থ্য হিংসার বিষয়টি নিয়ে সমাজে এখনও অনেক সময় খোলাখুলি আলোচনা হয় না। বহু ক্ষেত্রেই লজ্জা, সামাজিক চাপ বা পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে অনেক নারী এই ধরনের সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না। সেলিনার বক্তব্য অনুযায়ী, এই নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙা জরুরি। বর্তমানে সন্তানদের হেফাজত এবং বিবাহবিচ্ছেদের মামলার জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন সেলিনা। একদিকে ব্যক্তিগত জীবনের গভীর সংকট, অন্যদিকে আইনি লড়াই, এসব নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন অভিনেত্রী। তবুও তিনি আশাবাদী যে এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্য নারীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরতে পারবেন। সেলিনা জেটলির এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছেন, আবার অনেকেই এই ঘটনাকে গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Celina Jaitly abuse case | অজি স্বামীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ: ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে নীরবতা ভাঙলেন সেলিনা জেটলি



