সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী খড়িবাড়ি (Kharibari) অঞ্চলে ভুয়ো জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্রের মাধ্যমে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে, এই অভিযোগ ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, “এটি কেবল আইন ভঙ্গ নয়, ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর এক বড়সড় আঘাত।” তাঁর দাবি, এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার মাধ্যমে তদন্তই একমাত্র পথ।
দার্জিলিং জেলার খড়িবাড়ি, যা ভারত-নেপাল সীমান্তের খুব কাছেই অবস্থিত, বহুদিন ধরেই অনুপ্রবেশ ও জাল নথি তৈরির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এবার সেখানে নতুন করে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য, জানা গিয়েছে, স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি ও সরকারি কর্মী মিলে ভুয়ো জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র তৈরি করে বিদেশিদের ভারতীয় নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট দিতে সাহায্য করছে। বিজেপির অভিযোগ, এই ঘটনার ফলে দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো দুই-ই বিপন্ন হচ্ছে। শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, “যদি কোনও সরকারি দপ্তর থেকেই ভুয়ো সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়, তাহলে সেটি রাজ্য সরকারের চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। আমরা চাই সিবিআই (CBI) বা এনআইএ (NIA) এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করুক। এটা শুধু স্থানীয় ইস্যু নয়, এটি ভারতের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত।”
উল্লেখ্য যে, এই ঘটনার সূত্রপাত হয় উত্তরবঙ্গের বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) -এর অভিযোগ থেকে। তিনি বলেন, “খড়িবাড়ির প্রশাসনিক কার্যালয়ের ভেতরে এমন একটি চক্র কাজ করছে যারা টাকার বিনিময়ে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দিতে জাল সার্টিফিকেট তৈরি করছে। রাজ্য প্রশাসন জানলেও কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।” তাঁর এই অভিযোগের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব দাবি করেছে, সীমান্ত এলাকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলেছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার। দলের মুখপাত্ররা বলেছেন, “রাজ্যের সরকারি ব্যবস্থাকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এই অভিযোগকে “রাজনৈতিক নাটক” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিজেপি প্রতিবার নির্বাচনের আগে অনুপ্রবেশের গল্প বলে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। এইবারও তার ব্যতিক্রম নয়। রাজ্য সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।”এদিকে এক প্রাক্তন পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, “যদি সত্যিই বিদেশিরা ভুয়ো জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র ব্যবহার করে নাগরিকত্ব পাচ্ছে, তবে এটি কেবল সীমান্ত অপরাধ নয়, সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি। এমন ঘটনায় কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য যে, খড়িবাড়ি ভারতের উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তপথ, যা দিয়ে প্রতিদিন নেপাল এবং ভারতের মধ্যে বহু মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। এই এলাকায় প্রশাসনিক ত্রুটি বা দুর্নীতি ঘটলে তা গোটা পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, রাজ্যের শাসকদল রাজনৈতিক লাভের আশায় অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি নরম মনোভাব নিচ্ছে। শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, “তৃণমূল সরকার আইনকে উপহাসে পরিণত করেছে। আজ যদি খড়িবাড়িতে ভুয়ো নাগরিকত্বপত্র তৈরি হয়, কাল তা শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি, সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে।”
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Japan Visit | মোদীর জাপান সফর: কৌশলগত অংশীদারি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
যদিও এখনও তৃণমূলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি, বিশেষ সূত্রের খবর, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ও জেলার প্রশাসনের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক কূটনৈতিদের মতে, এই ইস্যু আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচন ও লোকসভা ভোট-এর আগে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। কারণ, “নাগরিকত্ব ও অনুপ্রবেশ” বরাবরই বিজেপির অন্যতম প্রচার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, কেন্দ্র যদি তদন্তে নামে, তাহলে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ দেখা দিতে পারে।
বর্তমানে খড়িবাড়ির স্থানীয় মানুষজনও আতঙ্কে রয়েছেন। এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা সীমান্তে থাকি। যদি এখানে বিদেশিরা নাগরিকত্ব পেয়ে যায়, তাহলে নিরাপত্তা কোথায়? প্রশাসনের উপর বিশ্বাস রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।” অন্যদিকে, রাজনৈতিক উত্তাপ যত বাড়ছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নও ততই ঘনীভূত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই ভুয়ো নাগরিকত্ব চক্রের আসল রূপ কতদূর প্রসারিত, এবং তদন্তের মাধ্যমে কারা ধরা পড়ে। ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় এ এক বড় পরীক্ষা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী




