West Bengal Voting-politics: পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতি: এগিয়ে কে-বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম না কংগ্রেস (আজ পনেরো-তম কিস্তি)

SHARE:

পশ্চিমবঙ্গের ভোট-রাজনীতির বিশ্লেষণ, তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেসের শক্তি, ইস্যু, সংগঠন ও সম্ভাবনার বিস্তারিত আলোচনা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার

(আজ পনেরো-তম কিস্তি)

পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি, ২০২৬-এর রণনীতি ও ভোটার মনোবল

Image

রাজনীতির মঞ্চে আজ All India Trinamool Congress (তৃণমূল কংগ্রেস বা TMC) এবং Bharatiya Janata Party (বিজেপি) যখন এক-অপরের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের ভোট-চিত্র শুধুই সংখ্যার যুদ্ধ নয়। এটি একাধিক ইস্যু ও ভাবনার ঢেউ তৈরি করছে ’identité’, উন্নয়ন, ধর্ম-ভিত্তিক রাজনৈতিক রুদ্ধদ্বার ও জনবিচার। এখানে আজকের কিস্তিতে সেই সব ভাব-আলোচনায় একটু ঘুরে আসব। এই রাজ্যীয় বিধানসভা নির্বাচন যেমন ছিল রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিষয়, তেমনি ছিল একান্ত আবেগ ও ভাবনার প্রতিফলনও। ২০১৬ সালের সাধারণ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ২১১টি আসনে জয়লাভ করেছিল, সেখানে Indian National Congress (কংগ্রেস) ৪৪টি ও বামফ্রন্ট ৩৩টি আসনে জয় পেয়েছিল। অন্যদিকে বিজেপি ও Gorkha Janmukti Morcha (জিজেএম) প্রত্যেকে ৩টি করে আসনে জয়লাভ করেছিল।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তার রেশ এখনও রাজ্যের রাজনৈতিক বাতাসে স্পষ্ট। নির্বাচনের মূল চরিত্র-রেখা কয়েকটি দিক দিয়ে ঠিক হয়ে গেছে রাজনৈতিক আইনচর্চা, বিষয়ভিত্তিক চ্যালেঞ্জ, সামাজিক গণবিচার ও রাজনৈতিক আচরণ। উল্লেখযোগ্য যে ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভার আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছিল ২২টি, আর বিজেপি ১৮টি। সেই ফলাফল নিজে থেকেই ইঙ্গিত দিয়েছিল “বিগ ব্যাটল” এখানে একদমই অন্য মাত্রায় যাচ্ছে।

ভোটারদের মন বসাতে কে কী বলেছে?
প্রথম দিকে মনে করা হচ্ছিল, বিজেপি হবে রাজ্যের বড় চ্যালেঞ্জার। তারা নির্দিষ্টভাবে নিজেকে “দ্বিগুন ইঞ্জিন সরকার” (রাজ্য ও কেন্দ্র উভয়তর) বলেছিল। একাংশ বিশ্লেষক মনে করেছিল “বামফ্রন্ট ও অন্যান্য বিরোধী দলের ভোট বিজেপির দিকে সরে যাচ্ছে, তাই বাজি রয়েছে বিজেপির উন্নয়নের উপর।”
কিন্তু রাজ্যের নির্বাচনে গত কয়েকদিন ধরে দেখা গেছে, শুধু উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক ইস্যুই নয় কোভিড-১৯, ঘূর্ণিঝড় যুক্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নাগরিকত্ব-অনুপ্রবেশ-শরণার্থী ইস্যু, পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণ-ভিত্তিক ভাবনা সব মিলিয়ে নির্বাচন আরও ধারালো হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, করোনা দ্বিতীয় তরঙ্গে রাজ্যে সংক্রমণের মাত্রা, মৃত্যু সংখ্যা ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় অভিযোগ উঠেছে এ বিষয়টি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড় “আমফান”-এর পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ উঠেছিল এটিও ভোটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে পাশ হওয়া Citizenship (Amendment) Act, 2019 (CAA) এবং পরবর্তী সময়ে বাংলায় “জাতীয় নাগরিকপঞ্জি” (NRC)-র প্রসঙ্গ উঠে আসে এ বিষয়টি ধর্মভিত্তিক ও অনুপ্রবেশ-ভিত্তিক আলোচনায় রূপ নেয়। সামগ্রিকভাবে, ২০২১-এর এই বিধানসভা নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক মেরুকরণ (Polarisation) এবং রাজনৈতিক পুনরায় সাজানো উভয়েরই মঞ্চ। বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই রাজ্যে কখনও এর চেয়ে বেশি মেরুকরণ যুক্ত ভোটাভুটি হয়নি।”

চোখ ঘোরায় এমন কিছু তথ্য

  • তৃণমূল পেয়েছিল প্রায় ৪৭.৯ শতাংশ ভোটভাগ রাজ্যের ইতিহাসের এক বৃহৎ ফলাফল।
  • বিজেপি উল্লেখযোগ্যভাবে জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু তৃণমূলকে পিছনে ফেলা সম্ভব হয়নি।
  • লড়াইয়ের অনেক আসনে বিজয়ের ব্যবধান ছিল বড় যেমন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১০ হাজার ভোটের উপরে ব্যবধান ছিল ২২৩টি আসনে।

ভবিষ্যতের দিকে নজর
২০২১-এর ফলাফলই আগামী নির্বাচনের (২০২৬-এর দিকে) রণনীতিকে প্রভাবিত করবে। তৃণমূল এখনও রাজ্যের শাসক দল হিসেবে রয়েছে, তবে বিরোধীদল হিসেবে বিজেপি যে কদম তুলে দিয়েছে, তা উপেক্ষা করা যায় না। পাশাপাশি বাম­ফ্রন্ট ও কংগ্রেসের অবস্থান সংকুচিত হয়েছে, যা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক সময়ে প্রচার ও সোশ্যাল মিডিয়া-র ভূমিকা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি। ভোটের আগে-পরে তথ্য-প্রচার, ‘ট্রেন্ড’ তৈরি করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম সবকিছু নির্বাচনের আঙ্গিকে এসেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও উত্তপ্ত হচ্ছে। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর তিন বছর পেরিয়ে, রাজ্যজুড়ে এখন নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত। All India Trinamool Congress (তৃণমূল কংগ্রেস), Bharatiya Janata Party (বিজেপি), Indian National Congress (কংগ্রেস) এবং বামফ্রন্ট চারটি পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ২০২১ সালের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টি আসনে জয়লাভ করে। বিজেপি থেমে যায় ৭৭-এ। বাম ও কংগ্রেস প্রায় ভোটহীন অবস্থায় ধাক্কা খায়। সেই ফলাফল শুধু এক নির্বাচনের জয়-পরাজয় নয় এটি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ব্যক্তিগত নেতৃত্বে জনসমর্থনের পুনর্জন্ম।

ভোটার মানসিকতা বদলে যাচ্ছে

২০২৬-এর দিকে তাকিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে বড় পরিবর্তন ধরা পড়ছে। ২০২১-এর নির্বাচনে যে “বিজেপি-তৃণমূল দ্বৈরথ” তৈরি হয়েছিল, এখন সেই দ্বৈরথ কিছুটা ক্লান্ত, কিছুটা নতুন রূপ নিচ্ছে। রাজ্যের বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের একাংশ এখন “দুর্নীতিহীন প্রশাসন” ও “বাস্তব উন্নয়ন” চাইছে। শহরে উন্নয়নমূলক প্রকল্প যেমন “দুয়ারে সরকার” ও “স্বাস্থ্যসাথী”-র প্রতি এখনও আগ্রহ আছে, তবে গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান, দামবৃদ্ধি ও যুবকদের অভাবনীয় হতাশা মূল ইস্যু হয়ে উঠছে। রাজনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, ২০২৬-এর ভোট হবে “পরিচালনামূলক যোগ্যতা বনাম বিকল্প আশ্বাস”-এর যুদ্ধ।

তৃণমূল কংগ্রেস: জনসংযোগের রাজনীতি

তৃণমূল কংগ্রেস এখনও শাসনক্ষমতায়, কিন্তু তাদের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ – ক) সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। খ) কেন্দ্র-রাজ্যের সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। গ) স্থানীয় স্তরে দলীয় অন্তর্কলহ কমানো। দলীয় সূত্রে খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৬-এর আগে “জনসংযোগ-যাত্রা ২.০” নামে একটি বড় রাজনৈতিক অভিযান পরিকল্পনা করছেন, যার মূল লক্ষ্য প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সরাসরি যোগাযোগ।তৃণমূলের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “দিদির (Mamata Banerjee) নেতৃত্বেই দল আজও রাজ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু তৃণমূলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এখন নিজস্ব ভাবমূর্তি।”

বিজেপি: পুনর্গঠনের পথে

বিজেপির সামনে এখন নতুন প্রশ্ন “২০২১-এর পর কীভাবে জনগণের বিশ্বাস ফিরে পাওয়া যায়?”
রাজ্য সংগঠনে রদবদল, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সফর, এবং যুব ভোটারদের দিকে বিশেষ নজর এগুলিই বিজেপির পরবর্তী কৌশল। দলীয় এক সাংগঠনিক সমন্বয়ক বলেন, “২০২৬-এর আগে আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার বুথ স্তরে যোগাযোগ, নতুন মুখ সামনে আনা এবং মমতা-বিরোধিতাকে উন্নয়ন-ভিত্তিক লড়াইয়ে রূপান্তর করা।” দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও বুঝতে পারছে, “অতিরিক্ত ধর্মীয় মেরুকরণ” এবার বিপরীত ফল দিতে পারে। তাই বিজেপির নতুন প্রচার-নীতি এখন “বাংলার উন্নয়নই ভারতীয় উন্নয়ন” এই স্লোগানে কেন্দ্রীভূত।

বাম-কংগ্রেস: হারানো জমি ফিরে পাওয়ার লড়াই

বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস জোট এখনও ধুঁকছে। “সংযুক্ত মোর্চা” (United Alliance) নামের আগের পরীক্ষায় ভোটার সাড়া দেননি। কিন্তু ২০২৬-এর দিকে তারা আবারও নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশেষত ছাত্র-যুব সংগঠনগুলিকে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। CPIM-এর এক নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় (Meenakshi Mukherjee) বলেন, “আমরা বুঝেছি, শুধু সমালোচনা করে জনগণকে পাওয়া যায় না। বিকল্প কর্মসূচি দিতে হবে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।” বাম দলগুলো এখন “Door to Door Red Campaign” চালু করেছে যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বেকারত্ব-ই হবে মুখ্য প্রচারভিত্তি।

নতুন শক্তি ও স্বাধীন প্রার্থী: গেম-চেঞ্জার সম্ভাবনা

২০২৬-এর ভোটে Independent এবং ছোট আঞ্চলিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা ও আলিপুরদুয়ার-এর মতো জেলাগুলিতে স্থানীয় আন্দোলন থেকে উঠে আসা সংগঠনগুলো নিজেদের প্রার্থী দেবে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “যদি মোট ভোটের ৫-৭ শতাংশও স্বাধীন প্রার্থী বা আঞ্চলিক দল পায়, তাহলে প্রধান দুই শিবিরের মধ্যে ফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকা হবে সিদ্ধান্তমূলক।”

ভোটার মনোবল, কী চায় মানুষ?

রাজ্যের ভোটার-মনোবল এখন তিনটি দিক ঘিরে, ক) অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খ) সামাজিক স্থিতিশীলতা গ) রাজ্য-কেন্দ্রের সমন্বিত উন্নয়ন, এক জনৈক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “আজকের ভোটার রাজনীতির ভাষায় নয়, বাস্তব জীবনের সমস্যায় ভোট দেন। যিনি চাকরি, দাম কমানো ও শান্তি দিতে পারবেন, তাকেই তাঁরা বেছে নেবেন।” বিশ্লেষণাত্মক সারমর্ম বলতে গেলে বলতে হয় ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন হবে শুধুই রাজনীতির লড়াই নয়, বরং এক সামাজিক মানসিকতার মাপকাঠি। একদিকে থাকবে “অভিজ্ঞ প্রশাসন”, অন্যদিকে “নতুন বিকল্পের আকর্ষণ”। রাজনীতি এখন আর কেবল র‍্যালির ভাষা নয় এটি হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতিদিনের প্রয়োজনের প্রতিফলন।

( চলবে)

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন