সাশ্রয় নিউজ ★ গুয়াহাটি : অসমের (Assam) রাজনীতিতে নাটকীয় মোড়। কংগ্রেসের প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি ভূপেন বরা (Bhupen Bora) অবশেষে বিজেপির পতাকা হাতে তুললেন। রবিবার অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma) -এর উপস্থিতিতে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। শুধু ভূপেন নন, তাঁর সঙ্গে এক ডজনের বেশি কংগ্রেস নেতা-সমর্থকও শাসকদলে নাম লেখান। বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই দলবদলকে রাজনৈতিক মহল ‘গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট’ বলেই মনে করছে। অসমে ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক আবহ। এই প্রেক্ষাপটে প্রদেশ কংগ্রেসে আচমকা ডামাডোল তৈরি হয় যখন ভূপেন বরা দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে (Mallikarjun Kharge) -এর কাছে ইস্তফাপত্র পাঠান। যদিও কংগ্রেসের হাই কমান্ড তড়িঘড়ি সেই পদত্যাগ গ্রহণ করেনি। বরং দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়।
দলীয় সূত্রে খবর, কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জিতেন্দ্র সিংহ (Jitendra Singh) দাবি করেছিলেন, ভূপেন তাঁর ইস্তফাপত্র প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু ভূপেন নিজে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি। তিনি বলেন, ‘আমি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সময় চেয়েছিলাম। আত্মসমালোচনা এবং সংশোধনের প্রতিশ্রুতি আশা করেছিলাম।’ তাঁর কথায় ইঙ্গিত ছিল, দলের ভিতরে অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরেই জমছিল। এই টানাপড়েনের মাঝেই ভূপেনের বাড়িতে যান হিমন্ত বিশ্বশর্মা। সাক্ষাতের পর তিনি জানান, অসম বিজেপির সভাপতি দিলীপ সাইকিয়ার (Dilip Saikia) সঙ্গে ভূপেনের আলোচনা হবে এবং যোগদানের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে। শেষ পর্যন্ত রবিবার সেই জল্পনার অবসান ঘটে। আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়ে ভূপেন বলেন, ‘বিজেপিতে যোগ দেব এই ভেবে আমি কংগ্রেস ছাড়িনি। আমি চেয়েছিলাম দল নিজের ভুলগুলি স্বীকার করুক। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পাইনি।’ ভূপেনের বক্তব্যে আরও উঠে আসে আঘাতের সুর। তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস অসমিয়া সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। আমি ৩২ বছর আদর্শ, বিবেক ও দেশপ্রেম নিয়ে দলকে সেবা করেছি। কিন্তু আজ আমি আহত।’ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, অসমের আঞ্চলিক আবেগ ও পরিচয় রাজনীতির প্রশ্নেই মতভেদ তৈরি হয়েছিল।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা ভূপেনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আজ থেকে ভূপেনের নতুন জীবন শুরু হল। বিজেপি পরিবার তাঁকে সম্মান, ভালোবাসা এবং দায়িত্ব দেবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, ভোটের আগে কংগ্রেসের শিবিরে ভাঙন ধরিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়াতে চাইছে বিজেপি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভূপেন বরা দীর্ঘদিন ধরে অসম কংগ্রেসের অন্যতম মুখ ছিলেন। তাঁর প্রস্থান কংগ্রেস সংগঠনের উপর বড় ধাক্কা। বিশেষত গ্রামীণ ও আঞ্চলিক স্তরে তাঁর প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের আগে এই দলবদল বিরোধী শিবিরের মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে।
কংগ্রেস অবশ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত, ‘দলবদল রাজনীতির অংশ। আদর্শে বিশ্বাসী কর্মীরা কংগ্রেসেই আছেন।’ তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই ঘটনাকে সহজ ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ভূপেন একা নন, তাঁর সঙ্গে একাধিক নেতা-সমর্থকের বিজেপিতে যাওয়া সংগঠনিক কাঠামোয় চাপ তৈরি করবে। অসমের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক পরিচয়, নাগরিকত্ব, ভাষা এবং উন্নয়ন এই সব ইস্যু বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ভূপেনের মন্তব্যে ‘অসমিয়া সম্প্রদায়ের অনুভূতি’ প্রসঙ্গ সামনে আসায় নতুন বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিজেপি শিবির এই সুযোগকে কৌশলগত ভাবে কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, নির্বাচনের আগে এই দলবদল কংগ্রেসের প্রচারকৌশলেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভূপেনের মতো অভিজ্ঞ নেতার অনুপস্থিতি সাংগঠনিক সমন্বয়ে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি এই যোগদানকে ‘কংগ্রেসের আদর্শগত দুর্বলতা’র প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু, অসমের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হল। ভূপেন বরার বিজেপিতে যোগদান শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত না, এটি নির্বাচনের আগে কৌশলগত পালাবদলের ইঙ্গিত। আগামী দিনে এর প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা বোঝা যাবে ভোটের ফলেই। তবে আপাতত স্পষ্ট, অসম রাজনীতিতে হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বে বিজেপি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Assam politics 2025, Himanta Biswa Sharma news | আসামে ঐতিহাসিক অধিবেশন: বহুবিবাহ ও লাভ-জিহাদ বিরোধী বিল আনছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বাস শর্মা



