সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা, ৫ জুন: তৃণমূল কংগ্রেস -এর অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে চলা মতভেদ ও চাপানউতোরের আবহের মধ্যেই বড় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিল দল। জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক শেষে ঘোষণা করা হল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) আগের মতোই দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকছেন। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যেমন দলীয় শিবিরে নতুন বার্তা পৌঁছেছে, তেমনই রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূল নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) জানান, দলের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, দায়িত্ব বণ্টন এবং রাজ্য নেতৃত্বে পরিবর্তনের মাধ্যমে দলকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, দল এখন নিজেদের ভিত আরও মজবুত করতে চাইছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ও জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, অন্দরের চাপের কারণে হয়তো নেতৃত্বে কিছু বদল আসতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব অভিষেকের উপরেই আস্থা রাখল। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সহায়তা করতে জাতীয় স্তরে দু’জন যুগ্ম সম্পাদক নিয়োগ করা হয়েছে। এই পদে রয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন (Derek O’Brien) এবং দোলা সেন (Dola Sen)। তাঁরা দু’জনেই অভিজ্ঞ সাংসদ ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত, ফলে জাতীয় স্তরে দলের কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে বলেই আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রস্তাব ও মতামত নিয়ে সেখানকার সংগঠন গঠন করা হবে।’ এর মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় বিস্তারের পরিকল্পনাকে আরও জোরদার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই দল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে, আর এই নতুন সিদ্ধান্ত সেই প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলের একাংশ ভিন্ন মত পোষণ করছে। তাঁদের মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে দলের অন্দরে যে অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছিল, সেই পরিস্থিতিতে তাঁকে একই পদে বহাল রাখা ভবিষ্যতে নতুন করে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাঁদের ধারণা, এতে করে অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও বাড়তে পারে। যদিও তৃণমূল নেতৃত্ব এই ধরনের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের তরফে বারবার বলা হয়েছে, সংগঠনের স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজ্য নেতৃত্বেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি সুব্রত বক্সী (Subrata Bakshi) বর্তমানে অসুস্থ। তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে (Chandrima Bhattacharya) এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘সুব্রত বক্সী এখন অসুস্থ, তাই তাঁর পরিবর্তে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্য স্তরে সহ-সভাপতির পদেও একাধিক নিয়োগ করা হয়েছে। সাজেদা আহমেদ (Sajeda Ahmed), নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় (Nayana Bandyopadhyay) সহ আরও কয়েকজন নেতা-নেত্রীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংগঠনের কাজ আরও গতিশীল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুব সংগঠনেও এসেছে বড়সড় রদবদল। সায়নী ঘোষকে (Saayoni Ghosh) যুব তৃণমূলের সভাপতি করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দলের সক্রিয় মুখ, ফলে এই দায়িত্বে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। একইভাবে, সর্বভারতীয় তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের সভাপতির পদে বসানো হয়েছে মালা রায়কে (Mala Roy)। ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বে আনা হয়েছে প্রিয়াঙ্কা অধিকারীকে (Priyanka Adhikari)। সংগঠনের মুখপাত্র পদেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘জাতীয় মুখপাত্র হিসেবে ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং আমি দায়িত্ব পালন করব। রাজ্য স্তরে মুখপাত্র হিসেবে থাকবেন কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)।’ এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলের বক্তব্য জনসমক্ষে আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই রদবদলের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস একদিকে যেমন নিজেদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় স্তরে দলকে বিস্তারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং সুসংগঠিত কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত তৃণমূল কংগ্রেসের এই নতুন সংগঠন কাঠামো রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Tajpur Port West Bengal | তাজপুর থেকে সরে দাদনপাত্রবাড়, গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে নতুন মোড়, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বড় প্রস্তাব ঘিরে চর্চা




