সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা : পূর্ব মেদিনীপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে বহুদিনের জল্পনায় এলো বড় পরিবর্তন। তাজপুর (Tajpur) ঘিরে দীর্ঘ পরিকল্পনার পর এবার সেই প্রকল্প সরিয়ে দাদনপাত্রবাড়ে (Dadanpatrabar) নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল রাজ্য সরকার। নবান্ন (Nabanna) থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই ঘোষণা করতেই নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানান, ‘তাজপুরে এই মুহূর্তে সরকারের হাতে পর্যাপ্ত জমি নেই। তাই সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে দাদনপাত্রবাড়ে প্রায় ১,৭০০ একর জমি রয়েছে, যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সেই জায়গাটিই আমরা করণ আদানিদের (Karan Adani) প্রস্তাব দিয়েছি।’ যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। এই ঘোষণার ফলে কার্যত নতুন দিক পেল বহু প্রতীক্ষিত এই মেগা প্রকল্প। আগে তাজপুরে যে বন্দরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহৎ উদ্যোগ। এর সঙ্গে যুক্ত পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা ছিল। পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর আমলে এই প্রকল্পকে ঘিরে বড় পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং সেটিকে গ্রিনফিল্ড পোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২২ সালের ১২ অক্টোবর, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নিজে করণ আদানি (Karan Adani) -এর হাতে ‘লেটার অফ ইনটেন্ট’ তুলে দিয়েছিলেন। দরপত্র প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দর হাঁকিয়ে আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকনমিক জোন (Adani Ports and Special Economic Zone বা APSEZ) এই প্রকল্পের দায়িত্ব পায়। কিন্তু তার পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। পর্দার আড়ালে তখন নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছিল বলে জানা যায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (Ministry of Home Affairs), প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (Ministry of Defence), বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs) এবং জাহাজ মন্ত্রক (Ministry of Shipping) -এর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সময় নির্ধারিত শর্ত পূরণ নিয়ে সমস্যার মুখে পড়ে আদানি গোষ্ঠী (Adani Group)। সূত্রের দাবি, ‘সমস্ত শর্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব হয়নি, ফলে ছাড়পত্র প্রক্রিয়াও এগোয়নি।’ ফলে প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। যদিও পূর্বতন সরকার কখনও প্রকাশ্যে আদানি গোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেনি, তবুও প্রশাসনিক স্তরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। শেষপর্যন্ত সেই পরিকল্পনা আর বাস্তব রূপ পায়নি।
এখন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তবে এবার তাজপুর নয়, দাদনপাত্রবাড়কে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় আগে একটি নুন কারখানা ছিল এবং সেখানে সরকারের হাতে বড় পরিমাণ জমি রয়েছে, যা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অর্থনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনেকটাই বাড়বে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে। স্থানীয় শিল্প, পরিবহণ ও লজিস্টিক্স ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিরোধী শিবিরের দাবি, এতদিন তাজপুরকে কেন্দ্র করে যে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ বদলে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত। অন্যদিকে শাসক শিবিরের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এখন নজর থাকবে আদানি গোষ্ঠী (Adani Group) এই নতুন প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রকগুলির ছাড়পত্র প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয় তার ওপর। কারণ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাদনপাত্রবাড়ে বন্দর গড়ে ওঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি পরিকাঠামো প্রকল্পই হবে না, বরং পূর্ব ভারতের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে নতুন দিক দেখাতে পারে। সেই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। কিন্তু বর্তমানে এই প্রস্তাব ঘিরে জোর আলোচনা চললেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামী কয়েক মাস। রাজ্যের অন্যতম বড় বিনিয়োগ প্রকল্প কোন পথে এগোয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Annapurna Yojana Bengal, Suvendu Adhikari Scheme Update | অন্নপূর্ণা যোজনায় কড়াকড়ি কেন? লক্ষ্মীর ভান্ডার জালিয়াতির উদাহরণ তুলে ব্যাখ্যা শুভেন্দুর




