সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্য রাজনীতিতে পালাবদলের পর প্রশাসনিক স্তরেও একের পর এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী -এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার তৃতীয় বৈঠকে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ‘মা ক্যান্টিন’ প্রকল্পের নাম বদল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের নতুন তারিখ নির্ধারণ, সব মিলিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুন দিশা তুলে ধরল রাজ্য সরকার। বৈঠক শেষে রাজ্যের দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) ও অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত ঘোষণা করেন।
করোনা পরিস্থিতির সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সরকারের উদ্যোগে চালু হয়েছিল ‘মা ক্যান্টিন’ প্রকল্প, যেখানে মাত্র ৫ টাকায় সাধারণ মানুষকে আহার দেওয়া হত। নতুন সরকার সেই প্রকল্প চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে নাম বদলে হচ্ছে ‘মা আহার’। দিলীপ ঘোষ জানান, ‘আগে ৩৯০টি কেন্দ্রে পাঁচ টাকায় খাবার দেওয়া হত, এখন আরও ১১০টি নতুন কেন্দ্র যুক্ত হচ্ছে। ফলে মোট ৫০০টি স্থানে এই পরিষেবা মিলবে।’ নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিষেবার বিস্তারকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এই প্রকল্পের সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বল্পমূল্যে আহারের সুযোগ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, শহর ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ এই সুবিধা পান। এ দিনের বৈঠকে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়েও বড় ঘোষণা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ‘২৮ লক্ষ ২৫ হাজার ৭৬৯ জন উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ পাঠানো হবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাঁরা আবেদন করবেন, তাঁদের ফর্ম যাচাই সম্পূর্ণ হলেই সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাঁচ জন মহিলার হাতে প্রতীকীভাবে ৩ হাজার টাকার চেক তুলে দেন শুভেন্দু, দিলীপ ও অগ্নিমিত্রা।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গ দিবসের তারিখ নিয়ে। এতদিন পয়লা বৈশাখকে এই দিবস হিসেবে পালন করা হত। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ জুন দিনটিকে সরকারি ভাবে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা হবে। দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ওই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল। তাই সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে ২০ জুন দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে।’ এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এছাড়াও জানানো হয়েছে, আগামী ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Syama Prasad Mukherjee) -এর জন্মতিথি উপলক্ষ্যে তাঁর একটি নতুন মূর্তি স্থাপন করা হবে। এর জন্য ইতিমধ্যেই জায়গা নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তে একাধিক স্থানে বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফ (Border Security Force)-কে ৩১.৯০৫ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘দক্ষিণ দিনাজপুরের ১১টি জায়গায় বেড়া নির্মাণের পর ১২.৭২১ একর জমির হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।’ পাশাপাশি নাগরাকাটায় ২০ একর জমি বন দফতরের মাধ্যমে রেল প্রকল্পের জন্য দেওয়া হচ্ছে। সেবক-রংপুর ব্রডগেজ লাইনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে এই জমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। আইন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজ্যের নতুন অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবে সুরজিৎনাথ মিত্র (Surjit Nath Mitra) -এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ এসসি, এসটি, ওবিসি ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড ফাইনান্স কর্পোরেশন পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সংস্থায় ৩৫৪টি নতুন পদ সৃষ্টির কথাও জানানো হয়েছে। নিকাশি কর্মীদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কেউ শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে তাঁর জন্যও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রশাসনিক কর্মীদের ক্ষেত্রেও আর্থিক পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের তরফে মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাহী সহকারীদের মাসিক বেতন ১৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভার এই ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলিকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অন্দরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে পুরনো প্রকল্পের নতুন রূপ, অন্যদিকে নতুন নীতি ও কাঠামো, সব দিকেই পরিবর্তনের ছাপ। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্তগুলির বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Dilip Ghosh Police Remark, Prashanta Barman Arrest | ফেরার অভিযুক্ত ধরা পড়তেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক দিলীপ ঘোষ




