সাশ্রয় নিউজ ★ বাঁকুড়া : সমাজমাধ্যমে আলাপ, প্রেমের প্রতিশ্রুতি, তার পর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিয়ো ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ, এই ঘটনার জেরে আত্মঘাতী ২৩ বছরের এক তরুণী। বর্ধমান (Bardhaman) শহরের একটি হোটেলে তোলা ঘনিষ্ঠ ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার অভিযোগ উঠেছে তরুণীর প্রেমিকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বাঁকুড়া (Bankura) জেলার পাত্রসায়ের (Patrasayer) থানা এলাকায়। অভিযুক্ত যুবকের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ।
শনিবার রাতে পাত্রসায়ের থানার অন্তর্গত এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় তরুণীর ঝুলন্ত দেহ। পরিবারের দাবি, অপমান ও মানসিক চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। রবিবার সকালে পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় শোক ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছে। পরিবার সূত্রে খবর, প্রায় তিন মাস আগে সমাজমাধ্যমে একজন যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণীর। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে সেই সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। তরুণী পরিবারের সদস্যদেরও জানিয়েছিলেন, ইন্দাস (Indas) থানার বাসিন্দা একজন সেনাকর্মীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ধীরে ধীরে দু’জনের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক গভীর হয়। পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘ও আমাদের বলেছিল, ছেলেটি সেনাবাহিনীতে কাজ করে। বিয়ের ইচ্ছের কথাও জানিয়েছিল।’ অভিযোগ, গত শুক্রবার দেখা করার জন্য তরুণীকে বর্ধমানে ডেকে পাঠান ওই যুবক। বাড়িতে তিনি জানান, বিউটি পার্লারের কাজ শেখার উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। সেই বিশ্বাসেই পরিবার তাঁকে যেতে দেয়। পরিবারের দাবি, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্ধমানের একটি হোটেলে তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন অভিযুক্ত। সেই সময় তাঁদের একান্ত মুহূর্ত মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে রাখেন যুবক।

মৃতার পরিবারের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের বক্তব্য, ‘ভুয়ো নাম-পরিচয় ও ঠিকানা দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে ওই যুবক। পরে সেই ভিডিয়ো দেখিয়ে আমাদের মেয়েকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে।’ অভিযোগ, যুবকের কথামতো না চলায় শনিবার সন্ধ্যায় ঘনিষ্ঠ ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরিচিত মহলে ভিডিয়োটি পৌঁছে গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তরুণী। অপমান ও লজ্জা সহ্য করতে না পেরে চরম সিদ্ধান্ত নেন বলে দাবি পরিবারের। মৃতার মামা বলেন, ‘প্রতারক প্রেমিক বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাগ্নিকে ফাঁদে ফেলে। দেখা করার নামে বর্ধমানে নিয়ে গিয়ে সম্পর্ক করে। তারপর সেই ভিডিয়ো দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করছিল। আমরা চাই, ওর কঠোরতম শাস্তি হোক।’ পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত যুবক নিজেকে সেনাকর্মী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন, তবে সেই তথ্যের সত্যতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, তরুণীর মোবাইল ফোন এবং সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এখনও পর্যন্ত অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা যায়নি। একজন পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাইবার শাখার সহায়তা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তকে দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিয়ো সম্মতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে গুরুতর অপরাধ। পাশাপাশি প্রতারণা, ব্ল্যাকমেল ও মানহানির ধারাতেও মামলা রুজু হতে পারে। সমাজমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বা ভিডিয়ো শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
মনোবিদদের একাংশের মতে, এ ধরনের ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা প্রবল মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন। সামাজিক অপমানের ভয়, পরিবারের সম্মানহানির আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাঁদের চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। একজন মনোবিদের কথায়, ‘সমাজমাধ্যমে অপমানজনক কনটেন্ট ভাইরাল হলে ভুক্তভোগীর মানসিক আঘাত বহুগুণ বেড়ে যায়। পরিবার ও সমাজের সহানুভূতি অত্যন্ত জরুরি।’ এই ঘটনার পর পাত্রসায়ের এলাকায় নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এমন ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিল। সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।’ অনেকেই দাবি তুলেছেন, অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। অন্যদিকে, তরুণীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক যেমন তেমনি সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। সমাজমাধ্যমের অপব্যবহার কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার নির্মম উদাহরণ এই ঘটনা। পুলিশি তদন্ত এগোচ্ছে, তবে পরিবারের একটাই দাবি, ‘ন্যায়বিচার চাই।’
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Physical Abuse | উদয়পুরে আতিথেয়তার মুখোশে বর্বরতা, ফরাসি পর্যটকের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে চাঞ্চল্য



