যোগসাধিকা রামিশা
মমতা রায়চৌধুরী
সহজ সরল অনাড়ম্বর মেয়েটিকে সব সময় বিদ্যালয় চত্বরে তার মুখমণ্ডলে অনাবিল হাসি বিনয়ী মনোভাব সকল শিক্ষিকার স্নেহের প্রিয় পাত্রী। সহপাঠীদের কাছেও সমান সমাদর। এই তো কদিন আগে ছোট্ট রামিশা কালনা হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এ পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হয়। আজ সেই রামিশাই বিশ্বের দরবারে সমাদৃত। তবে আজকের যোগ সাধিকা রামিশা হতে তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলতে হয়েছে। সেজন্য জীবনে তাকে কম লড়াই করতে হয়নি। ভেতরে ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে গেলেও তার নিরলস অধ্যাবসায় সমস্যার সঙ্গে মোকাবিলা করে নিজের উত্তরণ। লড়াই করে জিতে যাওয়া। তাই তো সে ‘ফাইট কোনি’ -এর মতো ‘ফাইট রামিশা ‘।

এই রামিশা পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনার ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা রহমত দফাদার ও আসমা তারা বিবির সন্তান। ওরা এক ভাই। এক বোন। দাদা অসীম দফাদার। ছোট থেকেই রামিশা দাদাকে দেখেছে যোগের প্রতি ধ্যান জ্ঞান। ওর দাদা নিজের বাড়িতেও একটা যোগাসন কেন্দ্র তৈরি করেছে। যোগাসনে তার হাতেখড়ি তার দাদার কাছেই। প্রথম প্রথম নিজেকে সুস্থ রাখার তাগিদেই দাদার পরামর্শে সে যোগাসন করতে শুরু করে । কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে যোগের প্রতি ভালবাসা আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশ্য প্রথম প্রথম এসব করতে গিয়ে তাকে চোট আঘাত প্রচুর পেতে হয়েছে। কিন্তু ওই যে মনের ভেতরে যার অদম্য খিদে, ভালবাসা। সেই ভালবাসাকে তো সে নস্যাৎ করতে পারে না। তাই সেই টানে উড়ান দিতে চায় দূর-বহুদূরে, সাত সমুদ্র তেরো নদীর পাড়ে।
মাত্র ১১ বছর বয়স থেকে রামিশা সম্পূর্ণভাবে যোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তার এই যোগাসনের সঙ্গে সঙ্গেই তার পড়াশোনাওকিন্তু সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে। ওর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়, ‘কালনা শশী বালা প্রাইমারি স্কুলে’, তারপর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে পরবর্তী উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয় ‘কালনা হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’-এ। অবশ্য রামিশা বলে যে, তার যোগের প্রতি অদম্য আগ্রহ যুগিয়েছেন তার দাদা ও মা। তার জীবনে তাঁদের এই দু’জনের ভূমিকা এতটাই যে, রামিশা তাঁদের কথা বলতে গিয়ে অনেক সময় তার দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সে এ কথাও বলে, বর্তমান ‘কালনা হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’-এর শিক্ষিকারাও এ বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। মাঝে মাঝেই তাকে নানান জায়গায় ট্রেনিং করতে যেতে হয়। তাই শিক্ষিকারাও ক্লাসের সমস্ত নোট, বই-পত্র দিয়ে তাকে সমানভাবে সাহায্য করেছেন। এবং উৎসাহিত করেছেন তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। তাই শিক্ষিকাদের কাছেও তার অবদান কম নয়। তাদের প্রতি প্রতিনিয়ত বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে কুণ্ঠিত নয়। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রামিশার দাদা বলেন, রামিশার মনের ভেতরের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বুঝতে পেরেই তাকে আন্তর্জাতিক মানের কোচের কাছে ট্রেনিং নেবার ব্যবস্থা করেন। কোন্নগরের বিশিষ্ট যোগ প্রশিক্ষক শ্রী গৌরাঙ্গ সরকার-এর সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ করেন। তারপর তাঁর তত্ত্বাবধানে আজকের রামিশা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। রামিশার ভেতরে ছোট থেকেই একটা লড়াকু, জেদি মনোভাব ছিল। তার ওপর তার বাবা সামান্য ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী। ফলে তাকে বারবার আর্থিক কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়েছে। কিন্তু তার জেদি মনোভাব তাকে তার লক্ষ্যতে অবিচল রেখেছে। তাই সে কষ্ট সহিষ্ণু, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এক বালিকা আমরা বলতে পারি। এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চোখের জল ঝরে পড়ে, যখন দেখা যায় রামিশা বলে, ২০১৭ সালে স্কুল গেমস যোগাসন প্রতিযোগিতায় তাকে তার শহরেরই ২ জন শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দেন এবং বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু সেই দিন থেকেই সে মনের ভেতরে একটা চাপা কষ্ট তুষের আগুনের মতো জ্বললেও ভেতরে ভেতরে নিজেকে তৈরি করেছিল তার টার্নিং পয়েন্টে পৌঁছানোর জন্য। তাই আজ রামিসা যোগ সাধিকা, যোগ কন্যা। একের পর এক সাফল্য এনে দিয়েছে, তার নিজের শহরের মুখ যেমন উজ্জ্বল করেছে, উজ্জ্বল করেছে নিজের জেলা, রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও উজ্জ্বল করেছে সমগ্র ভারতবর্ষের। অবশ্য তার ভেতরে একটা আক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে, ওই যে আগেই বললাম আর্থিক দুর্বলতা, তার সব সময়ের সঙ্গী। ৯৯ টি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সঙ্গে তার মাকে সে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে। ১০০ তম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সময় তাকে একলাই পাড়ি দিতে হয়েছে, তার নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শুধুমাত্র তার কোচকে সঙ্গে নিয়ে। মাত্র আর্থিক দুর্বলতার জন্য। তবে জীবনের এত বড় একটি প্রতিযোগিতায় মাকে ছাড়া কোচের সঙ্গে গিয়ে অংশগ্রহণ এবং এদিকে আর্থিক দুর্বলতার জন্য তার দাদাকে অর্থ জোগাড় করার জন্য নিজের প্রিয় কম্পিউটার বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার বোনের প্রতি তার দাদার যে এতটা আত্মত্যাগ সত্যিই অভাবনীয়। তবে তার সঙ্গে সঙ্গে তারা এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, কিছু শুভানুধ্যায়ী ব্যক্তি তাঁরাও আর্থিক সাহায্য করেছেন, এগিয়ে এসেছেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, এস ডি ও, বিডিও এমন কি তার বিদ্যালয়ের শিক্ষিকারা এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের শুভেচ্ছা ভালবাসা তার সঙ্গে নিরন্তর। এ সময় ভেতরে ভেতরে নিজেকে অসহায় মনে হয়েছিল কিন্তু তার সেই জেদি, লড়াকু মনোভাব তার ভেতরের সেই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে কখনওই মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেয়নি। এখানেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক মতি নন্দীর লেখা ‘কোনি’র ‘কোনি ফাইট কোনি ফাইট…।” সত্যিই তাকে ফাইট করে যেতে হচ্ছে নানা কুচক্রের বিরুদ্ধে, ফাইট করতে হচ্ছে আর্থিক দুর্বলতার সঙ্গে, ফাইট করতে হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে। এ যেন লড়াই করে যাওয়ার মহামন্ত্র রামিশা। তাই যেন সকলের (পাঠক বর্গের) শরীর মন জুড়ে সে এক গভীর উত্তেজনা, উন্মাদনা আর অনুপ্রেরণা সঞ্চার করে। তারই ফসল স্বরূপ সে একে একে উপহার দিতে থাকে নানান পদক। জেলা রাজ্য জাতীয় স্তরে সাফল্যের পাশাপাশি ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আয়োজিত যোগা চ্যাম্পিয়নশিপে একটি স্বর্ণপদক, দুটি রৌপ্য পদক ও একটি ব্রোঞ্জ পদক জয় লাভ করে।
এরপর ২০২২ সালের থাইল্যান্ডে এশিয়ান গেমস যোগা প্রতিযোগিতায় দুটি বিভাগে অংশগ্রহণ করে দুটি রৌপ্য পদক জয়লাভ করে। তারপর এ বছরই বিশ্ব যোগাসন প্রতিযোগিতায় পাঁচটি বিভাগে অংশগ্রহণ করে তিনটি স্বর্ণপদক, একটি রৌপ্য পদক ও একটি ব্রোঞ্জ পদক জয়লাভ করে। ভয় ভয় মনের ভেতরে কাজ করছিল ৪৩৭ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু সে লক্ষ্যে অবিচল। তাই ধৈর্য, নিষ্ঠা, অধ্যাবসায়, অনুশীলন চালিয়ে গেছে তাকে কি কেউ আটকাতে পারে? কথায় বলে “লাইফ ইজ নাথিং বাট স্ট্রাগল ফর এগজিস্টেনস।” ‘জীবনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয় কণ্টকাকীর্ণ সাফল্যের উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে হলে লক্ষ কোটি বাধা অতিক্রম করতে হয়। শ্যামপুকুরের বস্তির দরিদ্র পরিবারের মেয়ে “কোনি” যেমন করে লড়াই করেছিল কালনা শহরের ডাঙ্গাপাড়ার রামিশার জীবন অনেকটা তার মতই।
তাই তো আজ রামিশা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ঘরে আনল ৩টি স্বর্ণপদক, একটি রৌপ্য পদক, একটি ব্রোঞ্জ পদক। ওর এই সাফল্যে যেন খুশির আর আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। উপহার শুভেচ্ছা বার্তা আর অভিনন্দনে আজ রামিশা রঞ্জিত।
ভবিষ্যতে ও-একজন যোগ থেরাপিস্ট হয়ে সুস্থ সমাজ গড়ার কাজে নিজেকে নিবেদিত করতে চায়। শুধু তাই নয়, এছাড়া ক্রীড়া ক্ষেত্রে যোগাসন প্রতিযোগিতায় ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহী ও সাফল্যমণ্ডিত করাও তার লক্ষ্য। যোগের প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে সে উদ্বুদ্ধ করতে চায়। তাছাড়া তার ও তার কোচের পরবর্তী লক্ষ্য অলিম্পিকে যাওয়া। অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করে সে দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক, রামিশা-এর প্রতি থাকল আমাদের সেই শুভকামনা। সে আরও এগিয়ে চলুক। আর কোনির মতো ফাইট করুক।
আগামীদিনে আমরা সবাই তাকিয়ে থাকলাম তার উজ্জ্বল নক্ষত্র হবার দিকে। অনেক শুভেচ্ছা, শুভকামনা, ভালবাসা তার পথ চলায় থাকুক। যোগ কন্যা রামিশা আজ আমাদের কাছে নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল প্রতিমূর্তি এ কথা বলতেই পারি।
[প্রতিবেদক : কালনা হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়-এর শিক্ষিকা]




