সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কালীপুজোর রাতে উত্তর কলকাতার হেদুয়ার আকাশে রঙিন ফানুসের উড়ান (North Kolkata Fanush Tradition) বহু বছরের পরিচিত দৃশ্য। পুরনো বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করেন এলাকার বাসিন্দারা। ছোটদের উচ্ছ্বাস, বড়দের স্মৃতিচারণ আর হাতে তৈরি বিশালাকার ফানুসের আলো ইত্যাদি মিলিয়ে উত্তর কলকাতার কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি। কিন্তু এ বছর সেই পরিচিত ছবি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফানুস ওড়ানোর ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের পর প্রশাসনিক অনুমতি পেতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন একাধিক পুরনো পরিবার। তাঁদের তৈরি ফানুস প্রস্তুত থাকলেও সরকারি অনুমতি না মেলায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবারের দীপাবলির এই আয়োজন। বিশেষ করে ১০২ বছরের পুরনো দত্ত পরিবারের ঐতিহ্য এবার বন্ধ থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ।

উত্তর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের (Scottish Church College) কাছে ভোলানাথ ধামে দত্ত পরিবারের ফানুস তৈরির ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯২৪ সালে। পরিবারের প্রবীণ সদস্য মানিকলাল দত্তের হাত ধরে যে উদ্যোগের সূচনা, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। চলতি বছরে সেই ঐতিহ্য ১০২ বছরে পা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা এ বার পাঁচ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার মোট ১৫টি ফানুস তৈরি করেছেন। কিন্তু লাইসেন্স ছাড়া সেগুলি ওড়ানো যাবে না বলে প্রশাসনিক নির্দেশের পর থেকেই শুরু হয়েছে অনুমতির জন্য দৌড়ঝাঁপ। বর্তমানে পরিবারের এই ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্বে রয়েছেন অজয় দত্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমতির বিষয়ে জানতে লালবাজারে (Lalbazar) যোগাযোগ করার পর তাঁদের একাধিক দফতরের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভাগ (Arms and Ammunition Department) থেকে শুরু করে দমকল দফতর বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে হয়েছে পরিবারকে। পুলিশ কমিশনার ও দমকলের ডিজির কাছেও ই-মেল পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় থানাতেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের প্রতিলিপি জমা দিয়েছেন ওঁরা। কিন্তু এত চেষ্টা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত অনুমতি পাওয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
কোন দফতর থেকে লাইসেন্স মিলবে, কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে ও আবেদন জমা দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে অনুমতি পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে সংশয় আছে। একটা দফতর থেকে অন্য দফতরে যোগাযোগের পরেও প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা না পাওয়ায় হতাশ পরিবার। তাঁদের বক্তব্য, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনও ঝুঁকি নিতে চান না তাঁরা। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স না মিললে ১০২ বছরের পুরনো রীতিতে এ বছর ছেদ পড়তে পারে। দত্ত পরিবারের ফানুসের বিশেষত্ব অবশ্য তার নির্মাণশৈলীতে। বাজারে পাওয়া সাধারণ কাগজের লণ্ঠনের সঙ্গে এই ফানুসের তুলনা চলে না। পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই হাতে তৈরি করেন প্রতিটি ফানুস। জুট, কাপড় ও স্পিরিট ব্যবহার করে তৈরি হয় বিশেষ ব্যবস্থা। তাঁদের দাবি, এই কাজে প্যারাফিন ব্যবহার করা হয় না।
প্রতিটি ফানুস তৈরির পিছনে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, কারিগরি দক্ষতা ও মাপজোখের বিষয়। শুধু আকাশে ওড়ানো নয়, ফানুসের গায়েও ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও বিষয়। ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিঁদুর’—বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে তাঁদের তৈরি ফানুসে। হেদুয়ার কাছেই ধর ভিলার বাসিন্দা প্রদ্যুৎ কুমার মল্লিকের পরিবারও একই সমস্যার মুখে পড়েছে। প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বছর ধরে তাঁদের পরিবারে ফানুস ওড়ানোর রীতি চলে আসছে। প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫টি ফানুস ওঁরা তৈরি করেন। রঙিন নকশার পাশাপাশি লাট্টুর মতো দেখতে বিশেষ আকৃতির ফানুসও তৈরি করা হয়। কালীপুজোর জন্য আলাদা করে কালী ফানুস তৈরির রীতিও রয়েছে তাঁদের পরিবারে। কিন্তু এ বছর প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় সেই আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রদ্যুৎ মল্লিক স্থানীয় থানা, পুলিশ কমিশনার ও দমকলের ডিজির কাছে আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট অনুমতি পাননি বলে তাঁর অভিযোগ। প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না পাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, অনুমতি না মিললে এ বছর হয়ত আগের মতো ১০ থেকে ১৫টি ফানুস ওড়ানো সম্ভব হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী এক-দু’টি ফানুস ওড়ানোর কথাও ভাবছেন তাঁরা। তবে সরকারি নিয়ম অমান্য করে কোনও আয়োজন করতে রাজি নন পরিবারের সদস্যরা। শুধু হেদুয়া নয়, উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়াতেও এ বছর ফানুস উৎসবের পরিচিত জৌলুস কমতে পারে। ৮৭ বছর বয়সী শচীন মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁদের পাঁচতলা বাড়ি থেকে এবার ফানুস ওড়ানোর পরিকল্পনা নেই। পরিবর্তে আগামী ২২ নভেম্বর ভদ্রেশ্বরে তিনি ফানুস ওড়ানোর আয়োজন করবেন বলে উল্লেখ। সাধারণত জগদ্ধাত্রীপুজোর এক সপ্তাহ পর রবিবার বেলগাছিয়ায় এই অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। ফলে তাঁর সিদ্ধান্তে এলাকার বাসিন্দারা এ বছর পরিচিত আয়োজন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। শচীনবাবুর কথায়, নিজের হাতে ফানুস তৈরির ক্ষেত্রে এ বছরই হয়ত তাঁর শেষ বছর হতে চলেছে।
স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, প্রায় ১১০ বছর আগে হাটখোলা-দর্জিপাড়ার গৌরীশঙ্কর দে এই ফানুস ওড়ানোর রীতির সূচনা করেছিলেন। শব্দবাজির পরিবর্তে আলোর মাধ্যমে উৎসব পালনের একটি বিকল্প হিসেবেই ধীরে ধীরে এই প্রথা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে উত্তর কলকাতার বিভিন্ন পরিবার নিজেদের মতো করে ফানুস তৈরি ও ওড়ানোর রীতি চালু করে। কাগজ, কাপড়, জ্বালানি এবং কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রেখে একটি বড় ফানুস তৈরি করা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ অভ্যাস, দক্ষ হাত এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা। উত্তর কলকাতার বহু বাসিন্দার কাছে এই ফানুস শুধুমাত্র উৎসবের আয়োজন নয়। তা পারিবারিক স্মৃতি ও এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। কালীপুজোর রাতে ছাদে ছাদে মানুষের ভিড়, আকাশে একের পর এক ফানুসের উড়ান ও পরিবারের প্রবীণদের পুরনো দিনের গল্প, এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের আবেগ। তাই প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতায় এই আয়োজন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন না তুললেও ফানুস তৈরির সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির দাবি, অনুমতির নিয়ম ও আবেদনপদ্ধতি সহজভাবে জানানো দরকার। যাতে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রেখেও প্রশাসনিক বিধি মেনে উৎসব পালন করা যায়। এখন দত্ত ও মল্লিক পরিবারের তৈরি ফানুস অপেক্ষায় রয়েছে। শেষ মুহূর্তে অনুমতি মিলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত মিটলে হয়তো আবারও কালীপুজোর রাতে হেদুয়ার আকাশ আলোয় ভরে উঠবে। অন্যথায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা উত্তর কলকাতার এই ব্যতিক্রমী ফানুস ঐতিহ্যে প্রথমবারের মতো বড় ছেদ পড়তে পারে।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal development projects 2026, Nabanna meeting update | ৮২ হাজার কোটির প্রকল্পে নতুন গতি, ১২৫ দিনের কাজে মজুরি বাড়ল, নবান্নে বড় ঘোষণা শিবরাজের



