সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড : এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরাট কোহলির (Virat Kohli) শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে যুক্ত হল আরও একটি মূল্যবান পালক। দীর্ঘদিন ধরে যে রেকর্ডের মালিক ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তী সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar), এবার সেই কীর্তি নিজের নামে করে নিলেন কোহলি। সফল রান তাড়া করে দলকে জেতানোর ক্ষেত্রে এক দিনের ক্রিকেটে সর্বাধিক রানের মালিক হলেন ভারতের এই তারকা ব্যাটার। অকল্যান্ডে (Auckland) নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধে দুরন্ত ইনিংস খেলে সচিনকে পিছনে ফেলে দিলেন তিনি। ক্রিকেটবিশ্বে ‘চেজমাস্টার’ হিসেবে কোহলির পরিচিতি বহুদিনের। তবে এ বার পরিসংখ্যানের বিচারে সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি আরও বড় আকার পেল। শুধু একটি রেকর্ড ভাঙা নয়, এক দিনের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা, চাপের মুখে ব্যাটিং ও লক্ষ্য তাড়া করার অসাধারণ দক্ষতারও নতুন পরিচয় দিলেন ভারতীয় ব্যাটার।
অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে (Eden Park) নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৮৬ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নামে ভারত। তুলনামূলক ছোট লক্ষ্য হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রান তাড়া করার সময় প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে সামলানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের গতি বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন কোহলি। মাত্র ৫১ বলে ৭৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১৩টি চার এবং একটি ছক্কা। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেন ভারতীয় তারকা। তাঁর এই ইনিংসের উপর ভর করেই সহজে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ভারত। এই ম্যাচের আগে পর্যন্ত সফল রান তাড়া করে জেতার ক্ষেত্রে সর্বাধিক রানের রেকর্ড ছিল সচিনের দখলে। ভারতের হয়ে ২৩২টি ইনিংসে রান তাড়া করতে নেমে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ৮৭২০ রান। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিসংখ্যান ছিল এক দিনের ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কিন্তু অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নেমে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন কোহলি। ভারতের হয়ে সফল রান তাড়ার ক্ষেত্রে তাঁর সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৬৯টি ইনিংসে ৮৭৪১ রান। অর্থাৎ সচিনের তুলনায় কম ইনিংস খেলেই তাঁকে ছাপিয়ে গেলেন কোহলি। পরিসংখ্যানের এই ব্যবধানই প্রমাণ করে, লক্ষ্য তাড়া করার ক্ষেত্রে তাঁর ধারাবাহিকতা কতটা উল্লেখযোগ্য।
এই কৃতিত্বের তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ তালিকার শীর্ষ দুই স্থানেই এতদিন ভারতীয় ক্রিকেটের দুই প্রজন্মের সেরা ব্যাটারদের আধিপত্য ছিল। সচিনের পরেই এখন দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন রোহিত শর্মা (Rohit Sharma)। ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সফল রান তাড়া করে ১৬৩টি ইনিংসে করেছেন ৬৮০১ রান। যদিও ইনিংসের সংখ্যা বিবেচনায় রোহিতের পরিসংখ্যান যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য, কিন্তু মোট রানের নিরিখে কোহলি ও সচিনের সঙ্গে তাঁর ব্যবধান অনেকটাই। ফলে এক দিনের ক্রিকেটে ভারতের ব্যাটিং ঐতিহ্যে রান তাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতীয়দের আধিপত্য আরও জোরালো হয়েছে। এই তালিকায় ভারতীয়দের পর আছেন শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন তারকা সনৎ জয়সূর্য (Sanath Jayasuriya)। তিনি ২১০টি ইনিংসে সফল রান তাড়া করে সংগ্রহ করেছেন ৫৭৪২ রান। পঞ্চম স্থানে রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) প্রাক্তন অলরাউন্ডার জ্যাক কালিস (Jacques Kallis)। তাঁর সংগ্রহ ১৫৮টি ইনিংসে ৫৫৭৫ রান।
অর্থাৎ এই পরিসংখ্যানেও কোহলির সঙ্গে পরবর্তী ব্যাটারদের ব্যবধান যথেষ্ট বড়। বিশেষ করে সচিনের রেকর্ড অতিক্রম করার পাশাপাশি অনেক কম ইনিংসে এই জায়গায় পৌঁছনো কোহলির কৃতিত্বকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অকল্যান্ডের ম্যাচে কোহলির সাফল্য সফল রান চেজ করার রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একই দিনে এক দিনের ক্রিকেটে আরও একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ‘চেজমাস্টার’। বিশ্বের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ওয়ান ডে ক্রিকেটে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১৩ হাজার রানের গণ্ডি অতিক্রম করেছেন ভারতীয় তারকা। এই নজির গড়তে তাঁর প্রয়োজন ছিল মাত্র ১২ রান। ইনিংসের ১৩তম বলেই সেই রান সংগ্রহ করে নতুন ইতিহাস তৈরি করেন তিনি। ফলে একই ম্যাচে দুটি বড় ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জন করলেন কোহলি।
এক দিনের ক্রিকেটে তিন নম্বর ব্যাটিং পজিশনকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে তুলেছেন কোহলি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে এই জায়গায় ব্যাট করে দলকে ভরসা দিয়েছেন তিনি। কখনও শুরুতেই উইকেট হারানোর পর ইনিংস সামলেছেন, কখনও আবার শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে দ্রুত রান তুলেছেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানোর ক্ষমতাই তাঁকে এই পজিশনে এতটা সফল করেছে। তিন নম্বরে নেমে মাত্র ২৫১টি ইনিংসে ১৩ হাজার রান পূর্ণ করেছেন তিনি। এই জায়গায় তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৪৮টি শতরান ও ৭০টি অর্ধশতরান। অর্থাৎ শুধু বড় রান করাই নয়, ধারাবাহিকভাবে অর্ধশতরান ও শতরান করার ক্ষেত্রেও তাঁর সাফল্য উল্লেখযোগ্য। এই বিভাগে কোহলির পরিসংখ্যানের সঙ্গে অন্য ব্যাটারদের তুলনা করলেও তাঁর আধিপত্যের ছবি পাওয়া যায়। তিন নম্বরে ব্যাট করে সর্বাধিক রান সংগ্রহের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন অস্ট্রেলিয়ার (Australia) প্রাক্তন অধিনায়ক রিকি পন্টিং (Ricky Ponting)। তাঁর সংগ্রহ ১২,৬৬২ রান। কোহলি ইতিমধ্যেই সেই সংখ্যাকেও অতিক্রম করেছেন। দুই তারকার মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগও ভারতীয় ব্যাটারের সামনে। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনও তাঁর খেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই তালিকার পরবর্তী জায়গাগুলিতেও একাধিক কিংবদন্তি ব্যাটার আছেন। শ্রীলঙ্কার কুমার সঙ্গকারা (Kumar Sangakkara) তিন নম্বরে ব্যাট করে করেছেন ৯৭৪৭ রান। জ্যাক কালিসের সংগ্রহ ৭৭৭৪ রান। এর পর রয়েছেন নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসন (Kane Williamson), যাঁর রান ৬৫০৪। পাকিস্তানের বাবর আজম (Babar Azam) করেছেন ৬০৫৪ রান এবং ইংল্যান্ডের জো রুটের (Joe Root) সংগ্রহ ৫৫২৫ রান। এই তালিকায় বাবর ও রুটের মতো সক্রিয় ক্রিকেটার থাকলেও কোহলির সঙ্গে তাঁদের ব্যবধান এখনও অনেকটাই। কিন্তু কোহলির এই রেকর্ডের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং এক দিনের ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর অসাধারণ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বহুবার দেখা গিয়েছে, রান তাড়া করার সময় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলেও তিনি নিজের উইকেট ধরে রেখে দলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী এক-দুই রান নেওয়া, ফাঁকা জায়গায় বল পাঠানো কিংবা খারাপ বল পেলেই বাউন্ডারি হাঁকানো—সব ক্ষেত্রেই তাঁর দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। বিশেষ করে রান তাড়ার সময় ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর অন্যতম বড় শক্তি। আবার সচিন তেন্ডুলকরের মতো কিংবদন্তীর রেকর্ড অতিক্রম করা যে কোনও ভারতীয় ক্রিকেটারের কাছে বড় কৃতিত্ব। কারণ সচিনের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কেরিয়ার ও এক দিনের ক্রিকেটে তাঁর অসংখ্য নজির ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই জায়গায় পৌঁছে কোহলি নিজের কেরিয়ারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লিখলেন। তবে এই সাফল্যকে শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। ভারতের হয়ে ম্যাচ জেতানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান এবং দীর্ঘদিন ধরে দলের ব্যাটিংয়ের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীরা। কোহলি যদি সেই প্রতিযোগিতা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক এক দিনের ক্রিকেটে সক্রিয় থাকেন, তা হলে তাঁর সামনে আরও বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সফল রান তাড়া করে মোট রানের সংখ্যা এবং তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ের পরিসংখ্যান, দু’টিই আরও বাড়তে পারে। যদিও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের এবং দলের প্রয়োজনের উপর নির্ভর করবে, তবু বর্তমান ফর্ম ও রেকর্ডের নিরিখে তাঁর সামনে নতুন মাইলফলক তৈরির সুযোগও আছে। অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৭৪ রানের ইনিংস তাই নিছক একটি ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স নয়। এই ইনিংসের মাধ্যমে একদিকে সচিনের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভাঙলেন কোহলি, অন্যদিকে তিন নম্বরে ব্যাট করে ১৩ হাজার রানের অনন্য নজিরও গড়লেন। একই দিনে দুটি বড় কৃতিত্ব অর্জন করে আবারও বুঝিয়ে দিলেন, এক দিনের ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিংয়ের গুরুত্ব কতটা। ক্রিকেটের ময়দানে ‘চেজ়মাস্টার’ হিসেবে যে পরিচিতি তিনি অর্জন করেছেন, অকল্যান্ডের এই পারফরম্যান্স তার সঙ্গে যুক্ত করল নতুন ইতিহাস।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Darjeeling App, Darjeeling Ropeway | দার্জিলিংয়ে যানজটের দিন শেষ? পাঁচটি রোপওয়ে তৈরির পরিকল্পনা, পর্যটনে বড়সড় বদলের পথে পাহাড়



