সুজয়নীল দাশগুপ্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ★ অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড : ভারতীয় ক্রিকেটে অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের মেলবন্ধন যে কতটা কার্যকর, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম এক দিনের ম্যাচে ফের তার প্রমাণ মিলল। একদিকে রোহিত শর্মার (Rohit Sharma) অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি, অন্যদিকে বিরাট কোহলির (Virat Kohli) বিধ্বংসী ব্যাটিং! এই দুই তারকার পারফরম্যান্সে জয় দিয়ে এক দিনের সিরিজ শুরু করল ভারত। অকল্যান্ডে (Auckland) নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পর দলের দুই সিনিয়র ক্রিকেটারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ অধিনায়ক শুভমন গিল (Shubman Gill)। তাঁর মতে, রোহিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রান আউট ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। আর ব্যাট হাতে বিরাট কোহলি যে ভাবে রান তাড়া করেছেন, তাতে ভারতের জয় অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছে। তাই দলের সাফল্যের কৃতিত্ব দিতে গিয়ে দুই প্রাক্তন অধিনায়ককে আলাদা করে উল্লেখ করেছেন শুভমন। এই ম্যাচে ভারতের জয়ের পিছনে শুধু ব্যাটিংয়ের অবদান ছিল না। বোলিং এবং ফিল্ডিংয়েও নজর কেড়েছে ভারতীয় দল।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস ১৮৫ রানে শেষ করে দেন ভারতীয় বোলারেরা। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে একাধিক কার্যকর ব্যাটার থাকলেও তাঁদের বড় জুটি গড়ার সুযোগ দেয়নি ভারত। বিশেষ করে মাঝের ওভারে যখন ড্যারিল মিচেল (Daryl Mitchell) ও গ্লেন ফিলিপ্সের (Glenn Phillips) মধ্যে জমে উঠছিল পার্টনারশিপ, তখনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রোহিত শর্মা। তাঁর সরাসরি অংশগ্রহণে রান আউট হয়ে ফিরে যান মিচেল। সেই ঘটনা ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দেয় বলে মনে করছেন অধিনায়ক শুভমন গিল। ম্যাচের পর অধিনায়কের বক্তব্যে উঠে এসেছে রোহিতের সেই মুহূর্তের গুরুত্ব। শুভমনের মতে, মিচেল এবং ফিলিপ্স ক্রিজ়ে থাকলে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস আরও বড় হতে পারত। দু’জনেরই ভারতের বিরুদ্ধে অতীতে ভাল পারফরম্যান্স রয়েছে। সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজ়েও তাঁরা নিজেদের ব্যাটিং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের জুটি দীর্ঘায়িত হলে ভারতের সামনে রান তাড়া করার লক্ষ্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু মিচেল যখন ২৮ রানের মাথায় রান আউট হন, তখন কিউয়ি ইনিংসের গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত নড়ে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতীয় বোলারেরা প্রতিপক্ষের উপর চাপ বাড়াতে সক্ষম হন।
শুভমন বলেন, ‘আমাদের বোলিং এবং ফিল্ডিং দুটোই ভাল হয়েছিল। মিচেল ও ফিলিপ্সের মধ্যে তখন একটি ভাল জুটি তৈরি হচ্ছিল। সেই জুটি বড় হলে ম্যাচের পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু রোহিত ভাইয়ের রান আউট পুরো খেলাটার গতিপথ বদলে দিয়েছে।’ অধিনায়কের এই বক্তব্যে বোঝা গিয়েছে, শুধু রান বা উইকেটের হিসাব দিয়ে রোহিতের অবদান তিনি বিচার করতে চাইছেন না। মাঠে তাঁর অভিজ্ঞতা ও মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। রোহিতের সেই ফিল্ডিং দক্ষতার পাশাপাশি ভারতীয় বোলিং বিভাগের পারফরম্যান্সও এই ম্যাচে আলোচনায় উঠে এসেছে। অর্শদীপ সিং (Arshdeep Singh) চারটি উইকেট তুলে নিলেও রান খরচের দিক থেকে কিছুটা ব্যয়বহুল ছিলেন। তিনি ৭০ রান দিয়ে চার উইকেট নেন। তবে অন্য প্রান্তে অংশুল কম্বোজ (Anshul Kamboj) ও গুরনুর ব্রার (Gurnoor Brar) যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন। কম্বোজ ২২ রান দিয়ে ২টি উইকেট তুলে নেন। অন্যদিকে ব্রার ৪৪ রান খরচ করে ৩টি উইকেট পান। তাঁদের বোলিংয়ের ফলে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা ধারাবাহিকভাবে বড় শট খেলারও তেমন সুযোগ পাননি।
বিশেষ করে দুই তরুণ পেসারের বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন শুভমন। তাঁর মতে, অকল্যান্ডের পরিবেশ অংশুল কম্বোজের বোলিংয়ের পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক ছিল। নতুন বলের পাশাপাশি পুরনো বলেও সুইং করানোর ক্ষমতা রয়েছে এই ভারতীয় পেসারের। ফলে পিচ এবং আবহাওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের সমস্যায় ফেলতে পেরেছেন। অন্যদিকে গুরনুর ব্রারের উচ্চতা এবং স্বাভাবিক বাউন্স তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। এই ধরনের পিচে তাঁর বোলিং কার্যকর হয়েছে বলেই মনে করছেন ভারত অধিনায়ক। শুভমনের কথায়, ‘কম্বোজের জন্য এই পরিবেশ খুব ভাল। নতুন বল এবং পুরনো বল, দুটো দিয়েই ও সুইং করাতে পারে। অন্যদিকে ব্রার বাড়তি বাউন্স আদায় করতে পারে। এই পিচে দু’জনেই দুর্দান্ত বোলিং করেছে।’ দলের দুই পেসারের পারফরম্যান্স নিয়ে অধিনায়কের এই মূল্যায়ন ভবিষ্যতের ম্যাচগুলির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এক দিনের ক্রিকেটে মাঝের ওভারে উইকেট তুলে নেওয়ার পাশাপাশি রান আটকে রাখাও সমান জরুরি। প্রথম ম্যাচে সেই কাজটাই করতে পেরেছেন কম্বোজ ও ব্রার।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছেন বিরাট কোহলি। ১৮৬ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও রান তাড়ার শুরুতে ভারতকে ধাক্কা খেতে হয় রোহিতের উইকেট হারিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিজে এসে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাটিং শুরু করেন বিরাট কোহলি। বৃষ্টির কারণে ম্যাচের পরিবেশ আর পিচের আচরণ কিছুটা বদলে গিয়েছিল। বল দ্রুত ব্যাটে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারদের পক্ষে শট নির্বাচন করাও সহজ ছিল না। কিন্তু বিরাট নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন। তাঁর ৫১ বলে ৭৪ রানের ইনিংসে ছিল ১৩টি চার ও একটি ছক্কা। কোহলির ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী আক্রমণের মাত্রা নির্ধারণ করা। শুরুতেই বড় শট খেলার তাড়াহুড়ো না করে বিরাট প্রথমে ইনিংসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। তার পর সুযোগ বুঝে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের উপর পাল্টা আক্রমণ চালান। বৃষ্টির কারণে পিচের গতি বেড়ে যাওয়ায় বল ব্যাটে আসছিল দ্রুত। সেই পরিস্থিতিতে নিজের শটের সময় আর দিক নিয়ন্ত্রণ করে রান সংগ্রহ করেছেন। ভারত অধিনায়কের মতে, কোহলির এই ইনিংসের ফলে দলের বাকি ব্যাটারদের উপর চাপ অনেকটাই কমে যায়।
শুভমন বলেন, ‘বৃষ্টির মধ্যে রান তাড়া করা মোটেই সহজ নয়। বৃষ্টির কারণে পিচে বলের গতি বেড়ে গিয়েছিল। আমরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলার চেষ্টা করছিলাম। সেই সময় বিরাট ভাই যে ভাবে ব্যাট করেছে, তা অসাধারণ। ও আমাদের কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে।’ অধিনায়কের এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, কোহলির ইনিংসকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে ভারতীয় শিবির। শুধু ব্যক্তিগত রান সংগ্রহ নয়, কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচকে দ্রুত ভারতের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় ক্রিকেটে রোহিত-কোহলি জুটির গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। দু’জনেই একাধিকবার দলকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের করে এনেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা এখনও দলের তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে অত্যন্ত কার্যকর। অকল্যান্ডের ম্যাচে রোহিতের ফিল্ডিং ও কোহলির ব্যাটিং সেই অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। এক জন প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ জুটি ভাঙলেন, অন্য জন রান তাড়া করে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিলেন। তাই অধিনায়ক শুভমনের বক্তব্যে দুই তারকার নাম পাশাপাশি উঠে এসেছে।
এই জয়ের ফলে এক দিনের সিরিজে আত্মবিশ্বাসী শুরু করল ভারত। তবে সিরিজের লড়াই এখনও বাকি। প্রথম ম্যাচের সাফল্য ধরে রেখে পরবর্তী খেলাগুলিতেও একই রকম পারফরম্যান্স করতে চাইছে ভারতীয় দল। আগামী শনিবার ওয়েলিংটনে (Wellington) দ্বিতীয় এক দিনের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে নিউজিল্যান্ড ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। অন্যদিকে সিরিজের শুরুতেই এগিয়ে থাকা ভারত চাইবে দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে ব্যবধান বাড়াতে। ফলে পরের ম্যাচে দুই দলের লড়াই আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। ভারতের কাছে এই ম্যাচের জয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রোহিত ও কোহলির পারফরম্যান্সও ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দিক। একদিকে অভিজ্ঞতার জোরে ফিল্ডিংয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া, অন্যদিকে চাপের মুখে ব্যাট হাতে দায়িত্ব নেওয়া, দুই ক্ষেত্রেই নিজেদের কার্যকারিতা তাঁরা প্রমাণ করেছেন। শুভমন গিলের নেতৃত্বে ভারতীয় দল এখন এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণ ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের সমন্বয় ঘটাতে চাইছে। অকল্যান্ডে প্রথম ম্যাচের ফলাফল সেই পরিকল্পনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এখন দেখার, ওয়েলিংটনেও ‘রো-কো’ জুটির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সিরিজ়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে পারে কি না ভারত।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Rohit Sharma Retirement, Rohit Sharma 2027 World Cup | রোহিত শর্মার অবসর নিয়ে জল্পনা! ২০২৭ বিশ্বকাপের জল্পনায় মুখ খুললেন রোহিত




