সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : প্রযুক্তি দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের মধ্যেই ফের কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা অ্যামাজন (Amazon)। সংস্থার ডিভাইস বিভাগ থেকে একসঙ্গে প্রায় ২৫০ জন কর্মীকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে প্রযুক্তি শিল্পে। যাঁদের চাকরি গিয়েছে, তাঁদের একটা বড় অংশ সফ্টওয়্যার উন্নয়ন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ। কিন্ডল (Kindle) ই-রিডার, ইকো (Echo) স্মার্ট স্পিকার ও অ্যালেক্সা (Alexa)-নির্ভর প্রযুক্তিপণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত এই বিভাগে কর্মী সঙ্কোচনের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ, এক দিকে যখন সংস্থাটি নতুন নতুন প্রযুক্তিপণ্য বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্য দিকে তখনই কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে।
রয়টার্সের (Reuters) প্রতিবেদন সূত্রে খবর, গত বুধবার ভোরে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ইমেল ও মোবাইল ফোনে পাঠানো টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে চাকরি হারানোর কথা জানানো হয়। আচমকা এই সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। অ্যামাজনের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেরি রবিনসন (Sherry Robinson) কর্মীদের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি ইমেলে জানিয়েছেন, সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো আর কাজের ধরন নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনার পরেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। যদিও কত জন কর্মীকে সরানো হচ্ছে, সে বিষয়ে অ্যামাজন আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্দিষ্ট কোনও সংখ্যা প্রকাশ করেনি, রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রায় ২৫০ জনের চাকরি যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ব্যবসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, কাজের গতি আরও উন্নত করা ও ভবিষ্যতের পণ্য পরিকল্পনার সঙ্গে কর্মী কাঠামোর সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, যে সমস্ত পদকে ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সঙ্গে কম সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলি তুলে দেওয়ার পথে এগোচ্ছে সংস্থা। প্রযুক্তি শিল্পে বর্তমানে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে বড় সংস্থাগুলি কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি কর্মী কাঠামোও নতুন করে সাজাচ্ছে। অ্যামাজনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি দৃষ্টান্ত।
কিন্তু, এই ছাঁটাইয়ের সময়কাল বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, এর ঠিক আগের দিনই সফ্টওয়্যার উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে অ্যামাজনের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নেতৃত্বের একটি অভ্যন্তরীণ মেমো প্রকাশ্যে আসে। ওই নথিটি সেপ্টেম্বর মাসে তৈরি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সেখানে কর্মীদের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সফ্টওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে কাজের ধরন আমূল বদলে যেতে পারে বলেও ওই মেমোয় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়। এই পরিস্থিতিতে অ্যামাজনের ডিভাইস বিভাগে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। সফ্টওয়্যার উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যখন এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে, তখন মানুষের কাজের প্রয়োজনীয়তা কতটা বদলাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে প্রযুক্তি কর্মীদের মধ্যে। যদিও অ্যামাজন সরাসরি জানায়নি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণেই এই ২৫০ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে, তবুও এআই-নির্ভর কাজের প্রসার এবং কর্মী সংকোচনের সময়ের মিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কাছে এখন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা বড় লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে দিন কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর সামনে আসে, সেই দিনই নতুন পাঁচটি অ্যালেক্সা-চালিত ডিভাইস বাজারে আনার ঘোষণা করে অ্যামাজন। নতুন পণ্যগুলির মধ্যে রয়েছে নকশায় পরিবর্তন আনা ইকো শো ১৬ (Echo Show 16), অ্যালেক্সা ফটো ফ্রেম (Alexa Photo Frame) ও ইকো টাইম বেডসাইড ক্লক (Echo Time Bedside Clock)। এই পণ্যগুলি সংস্থার ডিভাইস বিভাগেরই অন্তর্গত। ফলে একই দিনে নতুন পণ্য প্রকাশ এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা প্রযুক্তি ব্যবসার বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এক দিকে নতুন পণ্য তৈরি ও বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছে, অন্য দিকে সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মী কাঠামো ছোট করা হচ্ছে।
অ্যামাজনের ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই অবশ্য নতুন ঘটনা না। গত কয়েক মাস ধরেই সংস্থার বিভিন্ন বিভাগে পদ কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। চলতি মাসের গোড়ায় সংস্থার মূল খুচরো ব্যবসা বিভাগে প্রায় ১,০০০টি পদ কমানোর সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে এসেছিল। তার আগেও বড় মাপের কর্মী সংকোচনের পথে হেঁটেছিল সংস্থাটি। গত বছরের অক্টোবরে প্রায় ১৪ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্তের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরও ১৬ হাজার পদ তুলে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল। পরপর এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি ও ই-কমার্স সংস্থার কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য দিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তির পরিকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে অ্যামাজন। চলতি বছরে এই খাতে সংস্থার মোট বিনিয়োগ ২২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং পরিকাঠামো গড়ে তুলতে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় অ্যামাজনও পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। ফলে সংস্থার আর্থিক অগ্রাধিকার এবং কর্মী নিয়োগের নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
শুধু অ্যামাজন নয়, গোটা প্রযুক্তি শিল্পেই কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। Layoffs.fyi-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও বেশি চাকরি কমেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, কর্মী সংকোচন কোনও একটি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি সংস্থা ব্যবসার খরচ কমানো, সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই তালিকায় আছে ড্রপবক্স (Dropbox)-এর মতো সংস্থাও। তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ ছাঁটাই করার কথা জানিয়েছে। অন্য দিকে, মাইক্রোসফ্ট (Microsoft) প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় সংস্থা ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রযুক্তি শিল্পে কর্মীদের ধরে রাখা এবং নতুন দক্ষতার ভিত্তিতে কাজের কাঠামো তৈরি করা এখন সংস্থাগুলির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, ডেটা বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত পরিষেবার ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে থাকায় কর্মীদের দক্ষতার চাহিদাও বদলাচ্ছে। আগে যে কাজ সম্পন্ন করতে একাধিক কর্মীর প্রয়োজন হত, তার কিছু অংশ এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি কম কর্মী নিয়ে বেশি কাজ করার কৌশল গ্রহণ করছে। তবে এই পরিবর্তনের ফলে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হলেও পুরনো অনেক পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অ্যামাজনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই শুধুমাত্র ২৫০ জন কর্মীর চাকরি হারানোর ঘটনা নয়, বরং প্রযুক্তি শিল্পের বদলে যাওয়া কর্মসংস্থান পরিস্থিতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এক দিকে এআই পরিকাঠামোয় শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, অন্য দিকে সফ্টওয়্যার বিভাগের কর্মীদের ছাঁটাই, এই দুই প্রবণতা একই সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। আগামী দিনে প্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে নিয়োগের ধরন, কাজের দায়িত্ব এবং কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতায় আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এআইয়ের যুগে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুরনো কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা কতটা বজায় থাকবে, সেই প্রশ্নই এখন বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কর্মীদের ভাবিয়ে তুলছে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian GDP growth 7.8 percent, PM Narendra Modi GDP speech | ৭.৮ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির পর মোদীর নিশানা রাহুলকে, বিদেশ ভ্রমণ-বিয়ে-সোনা নিয়ে দেশবাসীকে তিন পরামর্শ



