সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে অধিনায়ক বদলের পর থেকেই কি বাড়ছে দূরত্ব? স্মৃতি মন্ধানা (Smriti Mandhana) ও হরমনপ্রীত কৌরের (Harmanpreet Kaur) সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। ভারত বনাম জিম্বাবোয়ে মহিলা দলের তৃতীয় একদিনের ম্যাচের পর প্রকাশ্যে আসা একটি ভিডিয়োকে কেন্দ্র করে ক্রিকেটমহলে তৈরি হয়েছে জল্পনা। ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, মাঠ ছাড়ার সময়ে ক্রিকেটারদের মধ্যে করমর্দন চললেও স্মৃতির সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা যায়নি হরমনপ্রীতকে। তিনি এগিয়ে গিয়ে অন্য এক সতীর্থের সঙ্গে হাত মেলান। ঘটনাটি নিছকই মুহূর্তের অসাবধানতা, নাকি দুই ক্রিকেটারের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েনের ইঙ্গিত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে ভিডিয়োর দৃশ্য দেখে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। দুই ক্রিকেটারের কেউই এই ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।
ঘটনাটি ঘিরে আলোচনা শুরু হওয়ার অন্যতম কারণ, ভারতীয় মহিলা দলের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন। দীর্ঘ দিন দলের নেতৃত্ব সামলানোর পর হরমনপ্রীত দায়িত্ব ছেড়েছেন। তাঁর জায়গায় অধিনায়ক করা হয়েছে স্মৃতি মন্ধানাকে। নেতৃত্ব বদলের পর থেকেই দলের অন্দরে দুই ক্রিকেটারের সম্পর্ক নিয়ে নানা দাবি সামনে এসেছে। এবার মাঠের একটি ছোট মুহূর্ত সেই আলোচনাকে ফের উসকে দিল। যদিও করমর্দনের সময়ে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা উঠে আসছে। প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োয় (যদিও সাশ্রয় নিউজ ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি) দেখা যাচ্ছে, ম্যাচ শেষে ভারতীয় ক্রিকেটারেরা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। সাজঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন স্মৃতি। সেই সময় বিপরীত দিক থেকে আসেন হরমনপ্রীত। দু’জনের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে স্মৃতিকে অন্য দিকে তাকাতে দেখা যায়। এরপর হরমনপ্রীত তাঁর পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পরের ক্রিকেটারের সঙ্গে হাত মেলান। কিছু ক্ষণ পরে স্মৃতি আবার সতীর্থদের দিকে তাকিয়ে হরমনপ্রীতের পিছনে থাকা দীপ্তি শর্মার (Deepti Sharma) সঙ্গে করমর্দন করেন। এই দৃশ্যের পরেই প্রশ্ন উঠেছে, স্মৃতি কী ইচ্ছাকৃত ভাবে হরমনপ্রীতের দিকে তাকাননি? নাকি স্মৃতিকে অন্য দিকে তাকাতে দেখে হরমনপ্রীত নিজেই হাত না মিলিয়ে এগিয়ে যান? ভিডিয়োয় দুই ক্রিকেটারের আচরণ দেখা গেলেও তাঁদের মনের ভাব বা ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। তাই একটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্যের ভিত্তিতে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবে অধিনায়ক বদলকে ঘিরে আগে থেকেই চলতে থাকা জল্পনার কারণে ঘটনাটি ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
গত ৬ অক্টোবর ভারতীয় মহিলা দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরমনপ্রীত সব ফরম্যাটে অধিনায়কের দায়িত্ব ছাড়ার পর স্মৃতি মন্ধানাকে নতুন অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পরদিন থেকেই দলের অন্দরে দুই ক্রিকেটারের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা ছড়াতে থাকে। সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের (Press Trust of India বা PTI) একটি প্রতিবেদনে ভারতীয় দলের এক সূত্রের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছিল, দুই ক্রিকেটারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে ও তার প্রভাব দলের পরিবেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। কিন্তু দুই ক্রিকেটারের তরফে তা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। উল্লেখ্য, স্মৃতি মন্ধানা দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার। অন্য দিকে, হরমনপ্রীত কৌরও দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার এবং দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলেছেন। ফলে অধিনায়কত্বের পরিবর্তনকে ঘিরে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে নেতৃত্বের দায়িত্ব এক ক্রিকেটারের হাত থেকে অন্য ক্রিকেটারের হাতে যাওয়ার অর্থই যে ব্যক্তিগত সম্পর্কে অবনতি, তা ধরে নেওয়া যায় না। দলের কৌশল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন ফরম্যাটে নেতৃত্বের প্রয়োজন, একাধিক বিষয় এই ধরনের পরিবর্তনের পিছনে কাজ করতে পারে।
অধিনায়ক নির্বাচন নিয়ে জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে স্মৃতির নেতৃত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা ও হরমনপ্রীতের ভবিষ্যৎ ভূমিকা। ক্রিকেটমহলের একাংশের দাবি, স্মৃতি অনেক দিন ধরেই নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। তবে নির্বাচকেরা এত দিন হরমনপ্রীতের উপরেই আস্থা রেখেছিলেন। ভারতীয় মহিলা দলের হয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও বড় প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার ভূমিকা এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে। অন্য দিকে, নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নিয়েও আলোচনা চলছিল। কিন্তু, স্মৃতি বা হরমনপ্রীত ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্য কোনও মন্তব্য এখনও করেনি বলেই উল্লেখ।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব থেকে ভারতের বিদায়ের পর নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচকেরা দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। হরমনপ্রীতকে টেস্ট ও এক দিনের দলের অধিনায়ক রেখে টি-টোয়েন্টির দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রস্তাবে তিনি সম্মত হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সব ফরম্যাটের নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং স্মৃতির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। এই ঘটনার প্রতিটি দিক নিয়ে আরও তথ্য সামনে না আসা পর্যন্ত নেতৃত্ব বদলের নেপথ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকেই একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারতীয় মহিলা দলের প্রাক্তন অধিনায়ক মিতালি রাজের (Mithali Raj) পুরনো মন্তব্যও এই প্রসঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ের পর মিতালি মত দিয়েছিলেন, স্মৃতিকে আরও আগেই এক দিনের দলের নেতৃত্ব দেওয়া যেতে পারত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমনপ্রীত টেস্ট ও এক দিনের দলের দায়িত্বে থাকলেও টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব তরুণ ক্রিকেটার শেফালি বর্মার (Shafali Verma) হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। মিতালির এই মতামত থেকে বোঝা যায়, ভারতীয় মহিলা দলের নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে ক্রিকেটমহলে দীর্ঘ দিন ধরেই আলোচনা চলছে। তবে তাঁর বক্তব্যকে স্মৃতি ও হরমনপ্রীতের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
আরও পড়ুন : Rohit Sharma : ২০২২-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরে টি-টোয়েন্টি দলে রোহিত শর্মা
এর আগেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে অধিনায়ক বদলকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় চার বছর আগে মিতালি রাজের কাছ থেকে এক দিনের দলের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন হরমনপ্রীত। সেই সময়েও দুই ক্রিকেটারের সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা আলোচনা হয়েছিল। নেতৃত্বের পরিবর্তন, দলের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ভূমিকা নিয়ে সেই সময় প্রশ্ন উঠেছিল। এবারও নতুন অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতির দায়িত্ব গ্রহণের পর একই ধরনের আলোচনা শুরু হওয়ায় পুরনো ঘটনাগুলির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানা হচ্ছে। কিন্তু, দলের মধ্যে সত্যিই কোনও বিভাজন তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনও নেই। একটি দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকলেও মাঠে তাঁদের পেশাদার দায়িত্ব পালন করতে হয়। অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতির সামনে যেমন দলের পারফরম্যান্স ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ থাকবে, তেমনই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে হরমনপ্রীতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নেতৃত্ব বদলের পর দলের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা, তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো ও বিভিন্ন ফরম্যাটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই ভারতীয় দলের কাছে বড় বিষয়।
এদিকে, হরমনপ্রীত ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে পারেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে তাঁর অবসর সংক্রান্ত কোনও নিশ্চিত ঘোষণা সামনে আসেনি। নেতৃত্বের দায়িত্ব ছাড়া ও ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা সিদ্ধান্ত। তাই অধিনায়কত্বের পরিবর্তন কিংবা একটি ভিডিয়োয় করমর্দন না করার দৃশ্যের ভিত্তিতে তাঁর অবসরের সম্ভাবনা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। উল্লেখ্য, ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। স্মৃতির নেতৃত্বে দল কী ভাবে এগোয় ও হরমনপ্রীত নতুন দায়িত্ব কাঠামোয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, সেদিকেই নজর থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের। ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে তৈরি হওয়া জল্পনার অবসান ঘটবে কি না, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের উপর। আপাতত দুই ক্রিকেটারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চললেও তাঁদের কেউই প্রকাশ্যে কোনও বিরোধের কথা জানাননি। তাই করমর্দনের ওই মুহূর্তকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের পাশাপাশি মাঠে তাঁদের পারফরম্যান্স আর দলের সাফল্যই আগামী দিনে বেশি গুরুত্ব পাবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Women Asian Games Gold | India vs Sri Lanka Women Final : এশিয়ান গেমসে সোনার মঞ্চে ভারতের মেয়েরা, শেফালি-স্মৃতি-রিচার ব্যাটিং ঝড়ে শ্রীলঙ্কা অলআউট মাত্র ৬৯ রানে



