সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ : ভারতের স্থানীয় কৃষিপণ্য এবার পাড়ি দিচ্ছে বিদেশের বাজারে। বিহারের পূর্ণিয়ার মাখানা পৌঁছে যাচ্ছে গ্রিসে, আর কর্ণাটকের কালাবুরাগির অড়হর ডাল যাচ্ছে মালদ্বীপে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) তাঁর মাসিক বেতার অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’ (Mann Ki Baat)-এর ১৩৯তম পর্বে এই দুই উদাহরণ তুলে ধরে ‘ভোকাল ফর লোকাল’ (Vocal for Local) উদ্যোগের গুরুত্বের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, স্থানীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ নেই, ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। এর ফলে কৃষকদের সামনে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে ও দেশীয় উৎপাদনের পরিচিতি বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, স্থানীয় পণ্য কেনা এবং দেশীয় উৎপাদকদের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উৎপাদিত কৃষিপণ্য যদি গুণমান বজায় রেখে বিদেশের বাজারে পৌঁছতে পারে, তা হলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পূর্ণিয়ার মাখানা ও কালাবুরাগির অড়হর ডালের বিদেশযাত্রার উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, আঞ্চলিক পণ্যেরও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা তৈরির সুযোগ রয়েছে। বিহারের পূর্ণিয়া জেলা মাখানা উৎপাদনের জন্য পরিচিত। মাখানা বা ফক্স নাট (Fox Nut) পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উপবাসের খাবার, হালকা জলখাবার এবং দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এর ব্যবহার রয়েছে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও এই পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়ায় উৎপাদকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। ‘মন কি বাত’-এ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পূর্ণিয়ার মাখানা এখন গ্রিসের বাজারে পৌঁছচ্ছে। স্থানীয় কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছনোর এই ঘটনা আঞ্চলিক উৎপাদনকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে, কর্ণাটকের কালাবুরাগি জেলা অড়হর ডাল উৎপাদনের জন্য পরিচিত। অড়হর বা তুর ডাল (Pigeon Pea) ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডালজাতীয় শস্যের চাহিদা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকলেও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের আয় অনেকটাই নির্ভর করে বাজারদর, উৎপাদন খরচ ও বিক্রির সুযোগের উপর। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কালাবুরাগির অড়হর ডাল এখন মালদ্বীপে রপ্তানি হচ্ছে। স্থানীয় কৃষিপণ্যের বিদেশের বাজারে প্রবেশের ফলে উৎপাদকদের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। ‘ভোকাল ফর লোকাল’ ধারণার মূল লক্ষ্য হল স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া ও দেশীয় উৎপাদকদের ব্যবসার পরিসর বাড়ানো। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কেনাকাটার সময় দেশীয় পণ্য বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে আবারও উঠে এসেছে, স্থানীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লে উৎপাদকদের পাশাপাশি পরিবহণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং বিপণনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও লাভবান হতে পারেন।
ভারতের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু পরিবার কৃষিকাজের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য যথাযথ বাজারে পৌঁছে দেওয়া সব সময় সহজ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহণ খরচ, সংরক্ষণের অভাব ও বাজারদরের ওঠানামা কৃষকদের লাভের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছনোর সুযোগ বাড়লে এই সমস্যাগুলির কিছুটা মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। তবে রপ্তানির সুফল সরাসরি কৃষকদের হাতে পৌঁছতে হলে উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। স্থানীয় কৃষিপণ্যকে বিদেশে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে পণ্যের গুণমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত নির্দিষ্ট মান, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং প্যাকেজিংয়ের শর্ত মেনে পণ্য সংগ্রহ করেন। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহণের ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীও স্থানীয় পণ্যের সাফল্যের ক্ষেত্রে গুণমান ও আকর্ষণীয় প্যাকেজিংয়ের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। পণ্যের উপস্থাপনা, মোড়ক ও বাজারজাতকরণের পদ্ধতি উন্নত হলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তা আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
মাখানা ও অড়হর ডালের উদাহরণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের কাছে বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তুলে ধরে। ভারতের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কৃষিপণ্য রয়েছে। কোথাও ফল, কোথাও মশলা, কোথাও ডাল, আবার কোথাও বিশেষ ধরনের শস্য উৎপাদিত হয়। সঠিক পরিকল্পনা, গুণমান বজায় রাখা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই পণ্যগুলিরও বিদেশে জায়গা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা বাজার কৌশল প্রয়োজন। উৎপাদনের পরিমাণ, পরিবহণের খরচ, সংরক্ষণের মেয়াদ এবং বিদেশি বাজারের নিয়মকানুন বিবেচনা করেই রপ্তানির পরিকল্পনা করা দরকার। উল্লেখ্য, উৎসবের মরসুমে দেশীয় পণ্য কেনার উপরও জোর দেওয়ার আহ্বান জায়েছেন প্রধানমন্ত্রী বলে উল্লেখ। দীপাবলি (Diwali) ও ছট পুজোর (Chhath Puja) মতো উৎসবের সময়ে দেশে কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ে। এই সময়ে স্থানীয়ভাবে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য সামগ্রী কিনলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দেশীয় উৎপাদকরা উপকৃত হতে পারেন। স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়লে উৎপাদকদের পণ্য বিক্রির সুযোগ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহণ ও খুচরো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাজের পরিসরও বাড়তে পারে।
দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির সঙ্গে আত্মনির্ভর ভারতের ধারণারও সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দেওয়া হলে দেশের ভিতরে উৎপাদন ও বিপণনের পরিকাঠামো শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে পণ্যের গুণমান, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং নিয়মিত সরবরাহের উপর গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে একবার প্রবেশ করাই যথেষ্ট নয়, সেখানে ধারাবাহিকভাবে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি। পূর্ণিয়ার মাখানা গ্রীসে ও কালাবুরাগির অড়হর ডাল মালদ্বীপে পৌঁছনোর উদাহরণ তাই কেবল দু’টি পণ্যের রপ্তানির ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে ভারতের আঞ্চলিক কৃষি উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। তবে রপ্তানির প্রকৃত সুফল কতটা কৃষকদের কাছে পৌঁছচ্ছে, তাঁদের বিক্রয়মূল্য কতটা বাড়ছে ও স্থানীয় কর্মসংস্থানে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, তা মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও প্রয়োজন।
‘মন কি বাত’-এর ১৩৯তম পর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যে স্থানীয় পণ্য কেনার অভ্যাসকে অর্থনৈতিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের মানুষ কেনাকাটার সময় দেশীয় উৎপাদকদের তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দিলে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। পাশাপাশি, মানোন্নয়ন ও কার্যকর বিপণনের মাধ্যমে আরও বেশি ভারতীয় কৃষিপণ্য বিদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। পূর্ণিয়ার মাখানা এবং কালাবুরাগির অড়হর ডালের উদাহরণ সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে। এখন নজর থাকবে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষিপণ্যও আন্তর্জাতিক বাজারে কতটা জায়গা করে নিতে পারে ও তার সুফল কতটা সরাসরি কৃষকদের আয় ও জীবিকার উন্নতিতে কাজে লাগে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Abhishek Sharma world record | India vs New Zealand T20 : অভিষেক শর্মার বিশ্বরেকর্ড, প্রথম বলেই ছক্কা! নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক জয়



