সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে বড় দাবি করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। আগামী তিন দশকেও কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে (Rahul Gandhi) নিশানা করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন শাহ। তাঁর অভিযোগ, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার বজায় রাখতেই নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগের বিরোধিতা করছে কংগ্রেস। ভোটে পরাজয়ের কারণ হিসেবে ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
নিজের ৬২তম জন্মদিনে দিল্লিতে যমুনা নদী পরিষ্কারের লক্ষ্যে ৮,৯৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন অমিত শাহ। সেই অনুষ্ঠান থেকেই কংগ্রেস এবং বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়েই ছিল রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান, বিরোধীদের নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ ও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ। পাশাপাশি রাহুলের বিদেশ সফর নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। শাহের বক্তব্য, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দূরে থেকে শুধু সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললে নির্বাচনে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে পথে নেমেছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA)। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ভোটাধিকার সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) পদত্যাগের দাবিও তুলেছে বিরোধী শিবির। এই দাবিগুলিকে সামনে রেখে গত ১৩ অক্টোবর দিল্লিতে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে মিছিল করে বিরোধীরা। আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ তৈরির চেষ্টা চললেও উৎসবের মরসুম শুরু হওয়ার পরে কর্মসূচির তীব্রতা কিছুটা কমেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই বলে আগেই জানিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। তাঁর অবস্থান ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। এই আবহে রাহুলের বিদেশ সফর নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতর শুরু হয়েছে। বিজেপির তরফে সম্প্রতি বিমানের ভিতরের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে দাবি করা হয়, চার দিনের সফরে ভিয়েতনামে যাচ্ছেন কংগ্রেস নেতা। সেই প্রসঙ্গ টেনেই রাহুলকে নিশানা করেন শাহ। রাহুলকে উদ্দেশ্য করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কটাক্ষ, ‘আমি জানি, আপনি এখন আমার কথা শুনতে পাবেন না। কারণ, আপনি বিদেশে কোথাও বসে রয়েছেন। সেই সফর নিয়ে কোনও ব্যাখ্যাও আপনি কখনও দেন না। সেটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু দিল্লিতে ফিরে আমার কথা শুনে রাখুন, আগামী ৩০ বছরেও আপনি ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।’ শাহের এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বিরোধীদের আন্দোলন এবং রাহুলের বিদেশ সফর—দুই বিষয়কেই একই সঙ্গে তুলে ধরে কংগ্রেসের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন ম
রাহুল গান্ধীর বিদেশ সফর নিয়ে এর আগেও একাধিকবার কটাক্ষ করেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের একাংশের অভিযোগ, দেশে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরব হওয়ার পর বিদেশে চলে যাচ্ছেন কংগ্রেস নেতা। বিজেপির তরফে এমন দাবিও করা হয়েছে যে, দিল্লিতে আন্দোলনের সময় সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ চালানোর পরে রাহুল ছুটি কাটাতে বিদেশে গিয়েছেন। আবার রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, বিদেশ সফরের পিছনে অন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে এই ধরনের অভিযোগের বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস। রাহুলের সফরকে কেন্দ্র করে বিজেপির আক্রমণকে রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হিসেবেই দেখছে বিরোধী দলটি। শুধু বিদেশ সফর নয়, ভোটে কারচুপির অভিযোগ নিয়েও কংগ্রেসকে পাল্টা আক্রমণ করেছেন অমিত শাহ। তাঁর দাবি, বিজেপি একের পর এক নির্বাচনে জয়ী হচ্ছে বলেই বিরোধীরা ভোটচুরির অভিযোগকে সামনে আনছে। শাহের বক্তব্য, নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার দায় নিজেদের রাজনৈতিক দুর্বলতার উপর না দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বিরোধীরা। তাঁর কথায়, ‘বিজেপি তো ভোটে জিতেই চলেছে। বিরোধীদের তাতেই অসুবিধা হচ্ছে। সেই কারণেই তারা ভোটচুরির অজুহাত নিয়ে এসেছে।’ যদিও ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের বিষয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও অব্যাহত।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের প্রসঙ্গও তোলেন শাহ। তাঁর অভিযোগ, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করছে কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘রাহুলজি, আপনি শুধু ভোটচুরি নিয়ে কথা বলেন, কারণ, আপনি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার দিতে চান। তাঁদের ভোটগুলি আগলে রাখতে চান।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনকে জাতীয় নিরাপত্তা ও নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে বিরোধীদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কংগ্রেসের নির্বাচনী ব্যর্থতা নিয়ে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেন শাহ। তাঁর দাবি, একাধিক রাজ্যে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে কংগ্রেস। নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই দলের নির্বাচনী দুর্বলতা শুরু হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাই কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করা যায় না বলেই তাঁর বক্তব্য। শাহের মতে, কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমস্যার শিকড় আরও গভীরে এবং নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবর্তে দলের নেতৃত্বের উচিত নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করা।
বিজেপির লম্বা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি আরও ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করলেই বিরোধীরা ভোটচুরির অভিযোগ তোলে। কীভাবে তিনি আগাম নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে ধারণা করছেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয় বলে দাবি শাহের। এর জবাবে নিজের রাজনৈতিক জীবন ও দেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন তিনি। শাহ বলেন, ‘আমি এই দেশেই জন্মেছি, এখানেই থাকি এবং এখানেই মারা যাব। প্রতি ছ’মাস অন্তর আমাকে বিদেশে যেতে হয় না। আমি এই দেশের মানুষের মাঝেই বাস করি।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে রাহুলের বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক আক্রমণ শানান অমিত শাহ। বিরোধীদের আন্দোলনের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শাহ। তাঁর বক্তব্য, মিছিল, অবস্থান বা জনরোষ তৈরির চেষ্টা করে নির্বাচনে মানুষের রায় বদলানো যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী সাফল্য পেতে হলে ভোটারদের সমর্থন অর্জন করতে হয় বলেই দাবি তাঁর। শাহের কথায়, ‘মানুষের রায় আপনারা রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে ও জনরোষ সৃষ্টি করে বদলাতে পারবেন না। শুধু আন্দোলন করে, অবস্থানে বসে ভোটে জেতা যায় না।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিকে নির্বাচনী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী।
রাহুল গান্ধীর পাশাপাশি দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল (Arvind Kejriwal)-এর আম আদমি পার্টিকেও (Aam Aadmi Party) আক্রমণ করেছেন শাহ। বিরোধী দলগুলির আন্দোলন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে চলা বিতর্কের মধ্যে তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও বাড়াতে পারে। একদিকে বিরোধীরা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বিজেপি সেই অভিযোগকে নির্বাচনী পরাজয়ের অজুহাত বলে দাবি করছে। ফলে এসআইআর, ভোটার তালিকা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক আগামী দিনেও জারি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sourav Ganguly, Delhi Capitals | অমিত মিশ্রকে স্পিন কোচ করলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়



