সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত (India) ও আমেরিকার (US) মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখালেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো (Marco Rubio)। প্রায় দেড় বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনও চুক্তিতে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়েনি। তবে রুবিয়োর দাবি, আলোচনার প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ। বাকি রয়েছে সামান্য কিছু বিষয়, যার মধ্যে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ ও বাক্যাংশের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য। তাঁর আশা, আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে।
তিন দিনের ভারত সফরে এসে মার্কিন বিদেশসচিবের এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, একদিকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে শুল্কনীতি, জ্বালানি আমদানি ও অভিবাসন সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান ঘিরে উদ্বেগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চুক্তির আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে রুবিয়োর দাবি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ (The Indian Express)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিয়ো জানিয়েছেন, ভারতকে লক্ষ্য করে শুল্ক বা ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করার কোনও পরিকল্পনা আমেরিকার নেই। তাঁর বক্তব্য, ভারতকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে মার্কিন প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ করছে না। নতুন দিল্লির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পারস্পরিক স্বার্থে বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ককে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিষয়ে রুবিয়োর বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাণিজ্যচুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে আশাবাদী মার্কিন বিদেশসচিবের বক্তব্য, আলোচনার বড় অংশ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাকি কাজের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তাঁর কথায়, চুক্তি সম্পন্ন হতে আর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন না। তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই আশাবাদ বাস্তবে কতটা দ্রুত ফল দেবে, তা নির্ভর করছে দুই দেশের আলোচনাকারীদের মধ্যে অবশিষ্ট মতপার্থক্য মেটানোর উপর।
প্রশ্ন উঠছে, কাজের ৯৯ শতাংশ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কেন চুক্তি এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি? রুবিয়োর বক্তব্য অনুযায়ী, বাধা কোনও জটিল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। বরং চুক্তির নির্দিষ্ট কয়েকটি শব্দ ও বাক্যাংশের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তিতে একটি শব্দের ব্যবহারও যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এই পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনও শর্তের ভাষা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা আলাদা হলে ভবিষ্যতে তার প্রয়োগ, দায়িত্ব নির্ধারণ কিংবা বাণিজ্যিক সুবিধা বণ্টন নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই চুক্তির প্রতিটি অংশের ভাষা নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চাইছে দুই দেশ। যদিও ঠিক কোন শব্দ বা বাক্যাংশ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনতে চাননি রুবিয়ো। তাঁর বক্তব্য, আলোচনার খুঁটিনাটি প্রকাশ করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। তবে ভাষাগত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ফলে চুক্তির শেষ পর্যায়ের এই বাধা কতটা সহজে মিটবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। একদিকে যখন প্রায় সম্পূর্ণ সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে চূড়ান্ত নথির ভাষা নিয়ে আলোচনা চলায় বোঝা যাচ্ছে, বাণিজ্যিক সমঝোতার শেষ ধাপটিও দুই দেশের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হল রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর আমেরিকার সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের ক্ষমতা। সম্প্রতি আমেরিকায় পাস হওয়া একটি আইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) হাতে এমন ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনে এমন দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলে ভারত-সহ একাধিক দেশের বাণিজ্যিক সমীকরণে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন দেশের উপর নির্ভর করে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিও সেই বৃহত্তর জ্বালানি কৌশলের অংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রশাসনের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নয়াদিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে রুবিয়ো জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট শুল্কনীতির উদ্দেশ্য ভারতকে নিশানা করা বা শাস্তি দেওয়া নয়। তবে এমন পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন ও ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের গুরুত্বও এখানে যথেষ্ট। অর্থাৎ, কোনও নীতির ঘোষিত উদ্দেশ্য ভারতের বিরুদ্ধে না হলেও তার বাস্তব প্রয়োগের প্রভাব ভারতীয় বাণিজ্য ও অর্থনীতির উপর পড়বে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শুল্কের পাশাপাশি মার্কিন ভিসা ও অভিবাসন নীতিও ভারতীয়দের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজ, পড়াশোনা কিংবা পেশাগত সুযোগের কারণে বহু ভারতীয় আমেরিকায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে ভিসা সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় কর্মী, পড়ুয়া ও বিভিন্ন সংস্থার উপর। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার অভিবাসন নীতি নিয়ে রুবিয়োর বক্তব্যও নজর কেড়েছে।
মার্কিন বিদেশসচিবের দাবি, আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যাগুলি সংশোধন করার চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। গত দুই দশক ধরে যে অবহেলা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ, তা কাটিয়ে উঠতেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই নীতির লক্ষ্য ভারত নয় বলেই তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিবাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে নির্দিষ্ট কোনও দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু, ভারতীয়দের কাছে এই আশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ভিসার নিয়ম, আবেদন প্রক্রিয়া এবং অভিবাসন নীতির প্রয়োগে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার উপর নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একই ভাবে বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রেও শুধু আলোচনার অগ্রগতি নয়, চূড়ান্ত চুক্তিতে কী কী শর্ত রাখা হচ্ছে, তা দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পমহলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিসর বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুই দেশের বাজারে পণ্য প্রবেশের শর্ত, শুল্কের কাঠামো ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নিয়ম নতুন করে নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তবে চুক্তির চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে আলোচনার টেবিলে ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তার উপর। ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার দাবি আশাব্যঞ্জক হলেও অবশিষ্ট বিষয়গুলির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
রুবিয়োর বক্তব্যে একদিকে যেমন দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আশা রয়েছে, অন্যদিকে শুল্ক ও ভিসা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বললেও ওয়াশিংটনের বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতির বাস্তব প্রভাব কতটা সীমিত থাকবে, তা ভবিষ্যতের পদক্ষেপেই বোঝা যাবে। আপাতত দুই দেশের বাণিজ্যচুক্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি শব্দ ও বাক্যাংশের ব্যাখ্যা। দীর্ঘ আলোচনার শেষ লগ্নে এসে সেই ভাষাগত জট কত দ্রুত কাটে, তার উপরই নির্ভর করছে বহু প্রতীক্ষিত চুক্তির পরবর্তী পদক্ষেপ। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে রুবিয়োর আশা পূরণ হলে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Robert E. Hall and Michael Woodford Win 2026 Economics Prize | অর্থনীতির ওঠানামা নিয়ন্ত্রণের গবেষণায় নোবেল, পুরস্কার পেলেন রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ড



