সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ (FTA) কার্যকরের পথে বড় ধাপ পেরিয়ে গেল নিউ জিল্যান্ড। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর নিউ জিল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভারত-নিউ জিল্যান্ড মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার প্রয়োজনীয় আইন পাস হয়েছে। ভোটাভুটিতে চুক্তির পক্ষে পড়েছে ৯৩টি ভোট, বিপক্ষে ২৯টি। ফলে চলতি বছরের শেষের আগেই দুই দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্য কাঠামো চালু হওয়ার পথ অনেকটাই তৈরি হল। ভারতীয় আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগে দুই দেশকেই নিজেদের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। উল্লেখ্য যে, এপ্রিলেই ভারত ও নিউ জিল্যান্ডের মধ্যে এই বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তিতে সই হলেই তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না। প্রয়োজন হয় সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার। সেই জায়গাতেই বুধবার বড় অগ্রগতি হয় ওয়েলিংটনে। নিউ জিল্যান্ডের পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টির পাশাপাশি বিরোধী লেবার পার্টি এবং ACT New Zealand -এর সদস্যরাও চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে উল্লেখ। পার্লামেন্টের সরকারি নথিতেও ৯৩-২৯ ভোটের হিসাব রয়েছে বলে সূত্রের খবর।

নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন (Christopher Luxon) এই অনুমোদনকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের বিপুল বাজারে নিউ জিল্যান্ডের রফতানিকারকদের জন্য নতুন দরজা খুলবে এই চুক্তির মাধ্যমে। নিউ জিল্যান্ডের বাণিজ্য ও বিনিয়োগমন্ত্রী টড ম্যাকলেও (Todd McClay) জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হলে প্রথম দিন থেকেই নিউ জিল্যান্ডের রফতানির ৫৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের পর ভারতের বাজারে নিউ জিল্যান্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশ রফতানির ক্ষেত্রে শুল্ক তুলে দেওয়া বা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। অন্য দিক থেকে ভারতের জন্যও চুক্তিটির গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে নিউ জিল্যান্ডের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। ভারত সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় ভারতের ১০০ শতাংশ রফতানি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বস্ত্র, চামড়া, জুতো, রত্ন ও অলঙ্কার, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও বিভিন্ন শ্রমনির্ভর শিল্প এই সুবিধা থেকে লাভ পেতে পারে।
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | ৪০ বছর পর ঐতিহাসিক সফর: কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক
ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এফটিএ (FTA) -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রফতানি বাজারের প্রসার। কোনও দেশের বাজারে পণ্য ঢোকার সময় আমদানি শুল্ক বেশি হলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ফলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রফতানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হয়। শুল্ক কমলে বা উঠে গেলে একই পণ্য তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে বাজারে পৌঁছতে পারে। ভারত-নিউ জিল্যান্ড চুক্তির ক্ষেত্রে এই সুবিধাই বস্ত্র, চামড়া, জুতো, রত্ন-অলঙ্কার এবং অন্যান্য শিল্পে রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে। চুক্তির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিনিয়োগ। নিউ জিল্যান্ড আগামী ১৫ বছরে ভারতে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে এই বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন : IPL 2027 Auction India | তিন বছর পর ভারতেই IPL নিলাম? ডিসেম্বরেই বড় আয়োজন! কোন শহর পাবে দায়িত্ব?
সূত্রের খবর, এই বিনিয়োগের প্রভাব সরাসরি বিদেশি পুঁজি আসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন কারখানা, উৎপাদন কেন্দ্র, প্রযুক্তি সহযোগিতা আর পরিষেবা খাতে বিনিয়োগ হলে তার সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্পে রফতানি বাড়লে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটা তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগের গতি, প্রকল্পের ধরন এবং বাণিজ্যিক বাস্তবায়নের উপর। পাশাপাশি, কৃষি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আলোচনার সময় কৃষি ও দুগ্ধ খাতের সংবেদনশীল বিষয়গুলিকে সুরক্ষিত রাখার দিকে নজর দিয়েছিল। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও দুগ্ধ স্বার্থকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও চুক্তির অংশ।

নিউ জিল্যান্ডের রফতানিকারকদের কাছেও ভারতীয় বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৪০ কোটির মানুষের বাজারে খাদ্য, কৃষিপণ্য, ফল, শিক্ষা, পর্যটন, পেশাদারি পরিষেবা ও বিভিন্ন উচ্চমূল্যের পণ্যের চাহিদা রয়েছে। নিউ জিল্যান্ড সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে সে দেশের রফতানিকারকেরা ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত বাজারে আরও সুবিধাজনকভাবে প্রবেশ করতে পারবেন। কিউইফ্রুট বা কিউই ফলের ক্ষেত্রেও শুল্ক কমার প্রভাব পড়তে পারে। নিউ জিল্যান্ড সরকারের হিসাবে, শুধু কিউইফ্রুট শিল্পই আগামী পাঁচ বছরে শুল্ক বাবদ প্রায় ১২৫ মিলিয়ন নিউ জিল্যান্ড ডলার সাশ্রয় করতে পারে। ফলে ভারতীয় বাজারে নিউ জিল্যান্ডের কৃষিপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবশ্য একেবারে এই নতুন নয়। ২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়া বছরে ভারত ও নিউ জিল্যান্ডের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা মিলিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৯৯ বিলিয়ন নিউ জিল্যান্ড ডলার। নিউ জিল্যান্ডের রফতানি বাজার হিসেবে ভারত ছিল নবম স্থানে। এফটিএ কার্যকর হলে এই বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে দুই দেশের। ভারতের দিক থেকে চুক্তিটির আর একটি সম্ভাব্য সুবিধা হল পরিষেবা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ। ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য নিউ জিল্যান্ডের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। অন্য দিকে নিউ জিল্যান্ডের সংস্থাগুলিও ভারতীয় বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও পরিষেবা ক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পারবে। ফলে এফটিএ শুধু পণ্য আমদানি-রফতানির বিষয় নয়, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির কাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) গত এপ্রিল মাসে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় জানিয়েছিলেন, এই এফটিএ কৃষক, যুবক, মহিলা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কারিগর, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিউ জিল্যান্ডের ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে কৃষি, উৎপাদন, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরা হয়েছিল। এখন লক্ষ্য অক্টোবরের দিকে। নিউ জিল্যান্ডের পার্লামেন্টে আইন পাস হয়ে যাওয়ায় চুক্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা সরে গেলেও এখনও দুই দেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। ভারতীয় বাণিজ্যসচিব রাজেশ অগ্রবাল (Rajesh Agrawal) জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব এফটিএ কার্যকর করার দিকে এগোচ্ছে ভারত। সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় রফতানিকারকদের সামনে নিউ জিল্যান্ডের বাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বস্ত্র, চামড়া, জুতো, রত্ন ও অলঙ্কার, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের সুবিধা রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এর পাশাপাশি নিউ জিল্যান্ডের পণ্যও ভারতীয় বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ এফটিএ-র প্রভাব শুধু একটি দেশের রফতানি বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু, চুক্তির সুফল কতটা বাস্তবে পৌঁছবে, তার উত্তর মিলবে কার্যকর হওয়ার পরের কয়েক বছরে। শুল্ক কমানো বাজারে প্রবেশের একটি বড় বাধা সরায়, কিন্তু রফতানি বাড়াতে পণ্যের মান, দাম, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজারের চাহিদা এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এফটিএ নতুন সুযোগ তৈরি করলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব থাকবে দুই দেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির উপর। এখন পর্যন্ত যা নিশ্চিত, তা হল যে, এপ্রিলের স্বাক্ষরের পর সেপ্টেম্বরেই চুক্তিটি বাস্তবায়নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নিউ জিল্যান্ডের পার্লামেন্টের ৯৩-২৯ ভোটে অনুমোদন ভারত-নিউ জিল্যান্ড বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আগামী দিনে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, শুল্ক ছাড় এবং বাজারে প্রবেশের সুবিধা কতটা বাস্তব বাণিজ্য বৃদ্ধিতে পরিণত হয়, সেটাই সবার লক্ষ্যে থাকবে। আর অক্টোবরের সম্ভাব্য কার্যকরের দিকে তাকিয়ে এখন ভারতীয় রফতানিকারক আর শিল্পমহলের অপেক্ষা নতুন এই বাণিজ্যদ্বার কতটা বড় সুযোগ এনে দেয়।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi Auckland speech, India New Zealand ties | ‘২৫ বছর আগে বন্ধুর দেওয়া মাফলার এখনও আছে’ : অকল্যান্ডে আবেগঘন মোদী, প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে পুরনো স্মৃতি ও নতুন সম্পর্কের বার্তা




