সংগ্রাম রাহা, সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা : চার দশকের দীর্ঘ বিরতি ভেঙে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রাখলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। আর প্রথম সফরেই দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল। অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর, দুই দেশের সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ (Strategic Partnership) উন্নীত করা হয়েছে। তিন দেশীয় সফরের শেষ ধাপে অকল্যান্ডে পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এই ঐতিহাসিক বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট, কৃষি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মোট ১৮টি সিদ্ধান্ত ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য
উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য দ্বিগুণ করে ৭ বিলিয়ন নিউজিল্যান্ড ডলারে (প্রায় ৩৫,০০০ কোটি রুপি) উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ও দুগ্ধজাত খাতের অভিজ্ঞতা এবং ভারতের বিশাল বাজার ও ডিজিটাল সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা হবে বলে দুই নেতাই আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক সহযোগিতায় বড় পদক্ষেপ
উইলিংটন ও নয়াদিল্লির, এই নতুন কৌশলগত সম্পর্কের অন্যতম মূল ভিত্তি হতে যাচ্ছে প্রতিরক্ষা ও নৌ-নিরাপত্তা। ভারত মহাসাগর ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দুই দেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে।
নৌবাহিনীর লজিস্টিক চুক্তি: ভারতীয় নৌবাহিনী এবং নিউজিল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্সের মধ্যে পারস্পরিক লজিস্টিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ডায়ালগ: দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বয়ের জন্য একটি নতুন ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি ডায়ালগ’ বা সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংলাপ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চার বছরের রোডম্যাপ: আগামী চার বছরের মধ্যে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ককে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে নতুন মেলবন্ধন
এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শুধু রাজনীতি বা ব্যবসাই নয়, প্রাধান্য পেয়েছে দুই দেশের মানুষের মধ্যকার নিবিড় যোগাযোগও। ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ক্রীড়া সম্পর্কের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অকল্যান্ডে একটি বিশেষ ক্রীড়া প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যা দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঘুরে দেখেন।
অকল্যান্ডের স্পার্ক অ্যারেনায় প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আবেগঘন বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, “ভারত ও নিউজিল্যান্ডের ভবিষ্যৎ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ভৌগোলিক দূরত্ব আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও বাধা নয়।” নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনও ভারতকে একটি “বিশ্বস্ত বন্ধু” হিসেবে বর্ণনা করে ভারতের অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
নতুন ভূ-রাজনীতিতে এই সফরের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাণিজ্যিকভাবে চিনের ওপর থেকে একক নির্ভরতা কমাতে নিউজিল্যান্ড যেমন ভারতের মতো বিশাল বাজারের দিকে ঝুঁকছে, তেমনই ভারতের জন্যও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড একটি আদর্শ সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
ছবি : সংগৃহীত



