Raghunathganj Padma river erosion | দোরগোড়ায় পদ্মা, এক রাতেই তলিয়ে গেল ১৯ বাড়ি ও প্রাচীন মন্দির! আতঙ্কে রঘুনাথগঞ্জ

SHARE:

মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লকের তারানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাধাকৃষ্ণপুরে ভয়াবহ নদীভাঙনে (Raghunathganj Padma river erosion) অন্তত ১৯টি বাড়ি ও একটি প্রাচীন মনসা মন্দির নদীতে তলিয়ে গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে আরও অন্তত ৫০ থেকে ৭০টি বাড়ি এখন ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে বলে উল্লেখ। 

সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুর্শিদাবাদ : এক সপ্তাহ আগেও পদ্মা নদী ছিল অনেকটা দূরে। নদীর পাড় আর বসতবাড়ির মধ্যে ছিল নিরাপদ দূরত্ব। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে গেল ছবিটা। রবিবার রাত নামতেই আচমকা বাড়ল নদীর স্রোত। তারপর একের পর এক ধস। চোখের সামনে ভিটেমাটি, দোকানপাট, চাষের জমি চলে গেল পদ্মার গর্ভে। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লকের তারানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাধাকৃষ্ণপুরে ভয়াবহ নদীভাঙনে (Raghunathganj Padma river erosion) অন্তত ১৯টি বাড়ি ও একটি প্রাচীন মনসা মন্দির নদীতে তলিয়ে গিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে আরও অন্তত ৫০ থেকে ৭০টি বাড়ি এখন ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে বলে উল্লেখ। 

আরও পড়ুন : Samserganj Erosin : ভাঙন তাণ্ডবে বিধ্বস্ত সামসেরগঞ্জ! কবে  কোথায় শেষ? দিনগুনছেন জেলাবাসী

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকেই রাধাকৃষ্ণপুর এলাকায় পদ্মার পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। কয়েক দিন ধরে নদীর পাড় ক্ষয়ে গেলেও রবিবার সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আচমকাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীর স্রোতের টানে মাটি আলগা হয়ে বড় বড় অংশ ধসে পড়তে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই নদী এগিয়ে আসে বসত এলাকার দিকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কও বাড়তে থাকে। অনেক পরিবার কোনও রকমে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। যাঁরা সময়মতো ঘর খালি করতে পারেননি, তাঁদের অনেকেরই চোখের সামনে বাড়িঘর নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেছেন। শুধু বসতবাড়ি নয়, ভাঙনের কবলে পড়েছে স্থানীয় ছোট ব্যবসাও। চায়ের দোকান, মিষ্টির দোকান, সাইকেল মেরামতির দোকান-সহ একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। বহু কৃষকের জমিও পদ্মার স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে। ফলে এক রাতের বিপর্যয়ে বহু পরিবার শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, জীবিকা নির্বাহের পথও হারিয়েছে। যে জায়গায় কয়েক দিন আগেও ছিল ঘরবাড়ি ও দোকান, সেখানে এখন নদীর জল। রাধাকৃষ্ণপুরের বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা প্রাচীন মনসা মন্দিরটির নদীগর্ভে চলে যাওয়া। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ওই মন্দিরও ভয়াবহ ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। নদীর পাড় সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটির অস্তিত্বও মুছে যায়। ফলে ভাঙনের ক্ষত শুধু বসতবাড়ি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলির এখন আশ্রয় রাস্তার ধারে, গাছের তলায় কিংবা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অনেকেই রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে। ঘর ছাড়ার সময় প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাননি বহু পরিবার। ফলে কাপড়চোপড়, আসবাব, রান্নার সামগ্রী থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, সবই নদীতে চলে গিয়েছে বলে তাঁদের দাবি। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সুপ্রিয়া দাসের পরিবারের অবস্থাও একই রকম। তাঁর দাবি, তাঁদের বাড়ির একাধিক অংশ নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, বারান্দা ও সীমানা প্রাচীর কিছুই রক্ষা করা যায়নি। আচমকা ভাঙন শুরু হওয়ায় ঘরের অধিকাংশ জিনিস বের করে আনার সুযোগও মেলেনি। ফলে এখন নতুন করে জীবন শুরু করার মতো কোনও সম্বল তাঁদের হাতে নেই। স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল দাসের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে নদী ভাঙনের খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছলেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, ‘বালির বস্তা ফেলে ভাঙন থামানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি।’ তাঁর দাবি, নদীর স্রোত যে ভাবে বসতির দিকে এগিয়ে আসছে, তাতে অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।

আর এক বাসিন্দা প্রেমকুমার সিংহও স্থায়ী প্রতিরোধের দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু বালির বস্তা দিয়ে পদ্মার স্রোত আটকানো সম্ভব নয়। দ্রুত বোল্ডার ফেলে শক্ত বাঁধ তৈরি না করা হলে আরও বহু বাড়ি নদীতে চলে যেতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভাঙনের বর্তমান গতি অব্যাহত থাকলে রাধাকৃষ্ণপুরের মূল বসতিও বড় বিপদের মুখে পড়বে। উল্লেখ্য, নদীভাঙনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করা পরিবারগুলির ক্ষোভও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা কাশীনাথ দাসের অভিযোগ, গত বছরও ভাঙনে তাঁদের বাড়ি নদীতে চলে গিয়েছিল। তখন প্রশাসনের তরফে পাট্টার জমি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই জমি এখনও হাতে পাননি তাঁরা। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নথিপত্রের জটিলতায় বিষয়টি আটকে রয়েছে বলে তাঁর দাবি। ফলে ফের ভাঙনের মুখে পড়ে নতুন করে তিনি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

আরও পড়ুন : Nadia Chapra online game love case, Murshidabad three women rescued | অনলাইন গেমে পরিচয়, প্রেমের ফাঁদে একই পরিবারের ৩ বধূ! সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছাড়ার পর মুর্শিদাবাদে পুলিশের জালে যুবক

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সোমবার এলাকায় পৌঁছন প্রশাসনের একাধিক আধিকারিক। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার সুরেন্দর সিংহ (Surender Singh), মহকুমাশাসক গাদ্দাম সুধীরকুমার রেড্ডি (Gaddam Sudheer Kumar Reddy), স্থানীয় বিডিও এবং সেচ দপ্তরের আধিকারিকেরা। ভাঙনপ্রবণ এলাকা ঘুরে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন তাঁরা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গেও কথা বলা হয়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, রবিবার রাত থেকেই বিপজ্জনক এলাকায় পুলিশি মাইকিং শুরু করা হয়। নদীর পাড়ের কাছাকাছি থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে এমন জায়গা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে এলাকায় পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে।

মহকুমাশাসকের তরফে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সেচ এবং ভাঙন প্রতিরোধ দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বোল্ডার ও জিয়ো ব্যাগ ব্যবহার করে নদীর পাড় রক্ষার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে নদীর স্রোতের তীব্রতা এবং ভাঙনের গতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। রাধাকৃষ্ণপুরের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হল নদীর সঙ্গে বসতির দূরত্ব। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মূল বসতি এলাকা এখন পদ্মার ভাঙনপ্রবণ অংশ থেকে মাত্র প্রায় ১০০ মিটার দূরে। অর্থাৎ, ভাঙন যদি আরও এগিয়ে আসে, তা হলে আগামী দিনে আরও বহু পরিবারকে ঘরছাড়া হতে হতে পারে। ফলে এখন শুধু ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পুনর্বাসন নয়, সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখে থাকা পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে।

পদ্মার ভাঙন মুর্শিদাবাদের নদীতীরবর্তী এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা। বর্ষার সময় নদীর জলস্তর এবং স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় পাড় ক্ষয়ের ঘটনা ঘটে। কিন্তু রাধাকৃষ্ণপুরে এবারের পরিস্থিতি স্থানীয়দের কাছে আলাদা আতঙ্ক তৈরি করেছে। কারণ কয়েক দিনের মধ্যে নদী যে গতিতে বসতির দিকে এগিয়েছে, তাতে বহু পরিবার বুঝে ওঠার আগেই সর্বস্ব হারিয়েছে। এক রাতের মধ্যে ১৯টি বাড়ি হারানোর ঘটনা সেই বিপদেরই ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছে। তার সঙ্গে মন্দির, দোকান এবং চাষের জমি হারিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে। যাঁরা ঘর হারিয়েছেন, তাঁদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং ভবিষ্যতের জন্য পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা। আর যাঁদের বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাঁদের রাত কাটছে নদীর দিকে তাকিয়ে। প্রশাসন দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও স্থানীয়দের আশঙ্কা কাটছে না। বোল্ডার, জিয়ো ব্যাগ এবং অস্থায়ী প্রতিরোধ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অপেক্ষা করছে গোটা এলাকা। পদ্মার স্রোত যদি ফের বাড়ে, তা হলে ১০০ মিটারের ওই দূরত্বও দ্রুত কমে আসতে পারে। তাই রাধাকৃষ্ণপুরে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে নদীভাঙন রোখার চেষ্টা। আর নদীর পাড়ে সর্বস্ব হারানো মানুষগুলির চোখে একটাই প্রশ্ন, পরের রাতটা তাঁরা কোথায় কাটাবেন?

ছবি : প্রতীকী 
আরও পড়ুন : Modi stops speech for Xi Jinping, Modi Xi Jinping BRICS Summit | ‘উনি ঠিক আছেন তো?’ জিনপিংকে দেখে বক্তৃতা থামালেন মোদী, ব্রিক্‌সের দ্বিতীয় দিনে ঐক্যের ডাক

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন