সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি, ৬ সেপ্টেম্বর : দিল্লিতে (Delhi) আচমকা ভেঙে পড়ল ছ’তলা একটি পুরনো হস্টেল ভবন। রবিবার দুপুরে চাণক্যপুরী (Chanakyapuri) লাগোয়া মতি বাগ (Moti Bagh) এলাকায় এই ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ধুলোর মেঘে ঢেকে যায় গোটা এলাকা। ধ্বংসস্তূপের নিচে একাধিক পড়ুয়া ও কয়েক জন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত তিন জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ। এদিকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যত এগোচ্ছে, ততই উদ্ধারকারীদের সামনে আসছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
ঘটনার পর থেকে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা পড়ুয়াদের সম্ভাব্য সংখ্যা। স্থানীয় সূত্রে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন পড়ুয়ার আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও ঠিক কত জন ভবনটির ভিতরে ছিলেন, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলের কাছের এক দোকানদার, যিনি ভবনটি ভেঙে পড়ার সময় নিজের দোকানেই ছিলেন, জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে এখনও মানুষের আওয়াজ কানে আসছে। তাঁর দাবি, আটকে থাকা পড়ুয়ারা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছেন। তাঁদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে ‘আমাদের বাঁচান’ বলে আকুতি। প্রত্যক্ষদর্শী ওই দোকানদারের বর্ণনায়, আচমকা এমন একটি শব্দ হয় যে প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেননি কী ঘটেছে। তাঁর কথায়, ‘হঠাৎ ভয়ঙ্কর শব্দে মনে হচ্ছিল মাটি কেঁপে উঠছে।’ শব্দ শুনেই তিনি দোকান থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। বাইরে এসে যা দেখেন, তাতে প্রায় হতবাক হয়ে যান। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে একটি ছ’তলা ভবন দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে তখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে ঘন ধুলো এবং ধোঁয়া। স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদারেরা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান।
ওই প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একাধিক মানুষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ওরা বাঁচানোর জন্য ডাকছে।’ তাঁর অনুমান, ভবনের ভিতরে বহু পড়ুয়া ছিলেন। শুধু পড়ুয়ারাই নয়, নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের কয়েক জনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা করছেন বলে উল্লেখ। ঘটনার নেপথ্যে ভবনের নিচের অংশের নির্মাণকাজ বা সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় ওই দোকানদারের দাবি, বাড়িটির বেসমেন্ট এলাকায় কিছুদিন ধরে কাজ চলছিল। ভবনের নীচের দিকের কয়েকটি স্তম্ভ নিয়ে কাজ করা হচ্ছিল বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘উপরের অংশে কাজ হলেও নিচের স্তম্ভগুলিতে সংস্কার চলছিল।’ সেই কাজের সময় সেখানে কত জন শ্রমিক ছিলেন, তাঁদের নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দিল্লি পুলিশের (Delhi Police) প্রাথমিক অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে ভবনটির বয়স ও নির্মাণকাজের বিষয়টি। পুলিশের তরফে জানা গিয়েছে, বাড়িটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরনো। সাধারণ আবাসিক বাড়ি হিসেবে নয়, দীর্ঘদিন ধরে ‘পেয়িং গেস্ট’ বা PG থাকার ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা হত। দুর্ঘটনার সময় ভবনের বেসমেন্ট অংশে কাজ চলছিল বলেও প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। ফলে ভবন ধসের সঙ্গে সেই কাজের কোনও যোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ আচমকা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ভবনটি। খবর পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দিল্লি দমকল বাহিনী (Delhi Fire Service)। দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ দমকলের কাছে বিপর্যয়ের খবর আসে। দ্রুত আটটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে পরে আরও দমকলের গাড়ি পাঠানো হয়। ধ্বংসস্তূপের বিশাল অংশ সরিয়ে ভিতরে আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় রয়েছেন কি না, তা জানতে উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য মানবকণ্ঠ শোনার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। কারণ, ধসে পড়া ভবনের ভিতরে ফাঁকা জায়গায় কেউ আটকে থাকলে দ্রুত উদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনাস্থলের আশপাশে ভিড় জমিয়েছেন। পুলিশের তরফে এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখে উদ্ধারকাজে যাতে সমস্যা না হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে তিন জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের দ্রুত দিল্লি এমস (AIIMS) ট্রমা কেয়ারে পাঠানো হয়। কিন্তু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই এক জনের মৃত্যু হয়। বাকি দু’জনকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে ও তাঁদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক কর্মীও আহত হন বলে জানা গিয়েছে। তাঁকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : Delhi | স্বচ্ছ দিল্লির ডাক: ‘নো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত (Rekha Gupta) ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। উদ্ধারকাজের অগ্রগতি এবং ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ঘটনাস্থলে পুলিশ, দমকল এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা একসঙ্গে কাজ করছেন। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই মামলা দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। ভবনটির বয়স, নির্মাণের কাঠামো, সাম্প্রতিক সংস্কারকাজ ও দুর্ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত মানুষজনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বেসমেন্টে চলা কাজের ধরন এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে তদন্ত করা হতে পারে। ভবনটি কী ভাবে এত দ্রুত ভেঙে পড়ল, তার কারণ জানতে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের একাংশের বক্তব্য, এত পুরনো একটি ভবনে এত সংখ্যক মানুষের বসবাস এবং একই সঙ্গে নির্মাণ বা সংস্কারকাজ চলার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। তবে ভবন ধসের প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও একটি কারণকে দায়ী করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের নিয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি যদি সত্যি হয় ও এখনও যদি পড়ুয়াদের কণ্ঠস্বর ভিতর থেকে পাওয়া যায়, তা হলে প্রতিটি মুহূর্ত উদ্ধারকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি অংশ ধীরে ধীরে সরিয়ে জীবিতদের খোঁজ চালানো হচ্ছে। একদিকে মৃতের সংখ্যা না বাড়ানোর চেষ্টা, অন্যদিকে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত বের করে আনার লড়াই, দুইয়ের মাঝেই চলছে দিল্লির এই ভয়াবহ হস্টেল ধসের উদ্ধার অভিযান। প্রশাসনের নজর এখন একটাই দিকে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ জীবিত রয়েছেন কি না এবং থাকলে যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Asian Games 2026 India cricket, Shreyas Iyer Japan match | এশিয়ান গেমসের আগে জাপানে ভারতের টি-টোয়েন্টি! শ্রেয়সদের ম্যাচের দিন-সময় ঘোষণা বিসিসিআইয়ের



