সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শুধু অন্যের সুরে কণ্ঠ দেওয়ার মধ্যে নিজের সঙ্গীতজীবনকে আটকে রাখতে চান না আকৃতি কক্কড় (Aakriti Kakkar)। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে হিন্দি ও বাংলা ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন তিনি। জনপ্রিয় হয়েছে একাধিক গান। রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চেও তাঁর উপস্থিতি বাঙালি শ্রোতার সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক তৈরি করেছে। কিন্তু দীর্ঘ এই পথ চলার পরে তাঁর উপলব্ধি, শুধু প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকা তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। নিজের সুর তৈরি করা, নিজের গান গাওয়া এবং এমন কিছু সৃষ্টি করে যাওয়া, যার সঙ্গে শ্রোতার দীর্ঘ সম্পর্ক তৈরি হয়, সেই দিকেই তিনি এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জন্মসূত্রে হিন্দিভাষী হলেও কলকাতার সঙ্গে আকৃতির সম্পর্ক বহু দিনের। ছোটবেলা থেকেই শহরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। পরবর্তী সময়ে বাংলা ছবিতে একের পর এক গান গেয়ে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ‘প্রেম কি বুঝিনি’, ‘মন বিবাগী’, ‘ওরে মনওয়া রে’, ‘তুই আমার হিরো’-র মতো বাংলা ছবির গানে তাঁর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে। কখনও কোয়েল মল্লিক (Koel Mallick), কখনও শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় (Subhashree Ganguly) -এর পর্দার চরিত্রের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ মিশে গিয়েছে। ফলে ভাষাগত ভাবে বাংলা তাঁর মাতৃভাষা না হলেও গানের সূত্রে বাঙালি শ্রোতার কাছে তিনি ধীরে ধীরে আপন হয়ে উঠেছেন।

সম্প্রতি কলকাতায় এসে নিজের সঙ্গীতজীবন, বাংলা গানের সঙ্গে সম্পর্ক ও বর্তমান সময়ের সঙ্গীতদুনিয়া নিয়ে কথা বলেছেন আকৃতি। বাংলা গান বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নাকি বেশ কিছুটা বাছবিচার থাকে। কোনও গান হাতে এলেই কণ্ঠ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন না তিনি। আগে গান শোনেন, তার কথা বোঝার চেষ্টা করেন, সুরের সঙ্গে নিজের মানসিক সংযোগ তৈরি হচ্ছে কি না তা দেখেন। তাঁর কথায়, ‘আমি কিন্তু খুব ভেবেচিন্তেই গান নির্বাচন করি।’ বর্তমান সঙ্গীতজগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেখানেও নিজের অবস্থান নিয়ে কোনও রাখঢাক করেননি আকৃতি। তাঁর কাছে গান শুধু সুর ও কণ্ঠের সমষ্টি নয়। মানুষের অনুভূতি, গানের কথা এবং গায়ক-গায়িকার নিজস্ব প্রকাশভঙ্গিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি গান শুনলে তার পার্থক্য তিনি ধরতে পারেন বলে দাবি করেছেন গায়িকা। সম্প্রতি ‘এরাও মানুষ’-এর জন্য গান গেয়েছেন আকৃতি। সঙ্গীত পরিচালক বালাসাই লাহিড়ীর (Balasai Lahiri) তৈরি সেই গান নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, গানটি শুনেই তার আবেগ ও সুরের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে অন্য একটি বাংলা ছবিতে গান গাওয়ার প্রস্তাব পেয়েও তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ গানটির ট্র্যাক শুনে তাঁর মনে হয়েছিল সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
আকৃতির মতে, মানুষের তৈরি সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অনুভূতি। তিনি বলেন, ‘মানুষের তৈরি গানের মধ্যে আবেগ থাকে। মন দিয়ে শুনলেই অনেক সময় বোঝা যায় গানটি কোথা থেকে এসেছে।’ তাঁর বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি সঙ্গীতে নিখুঁত প্রযুক্তিগত কাঠামো থাকলেও মানুষের অনুভূতির জায়গাটি আলাদা। তাই গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু পারিশ্রমিক বা কাজের সংখ্যা তাঁর কাছে প্রধান বিষয় নয়। তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাল গান। বহু গান গেয়ে ফেলার চেয়ে অল্প সংখ্যক হলেও মনে রাখার মতো গান তৈরি করতে পারাটাই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি। আর সেই কারণেই প্লেব্যাকের পাশাপাশি নিজস্ব গান তৈরি করার দিকে মন দিয়েছেন তিনি। চলচ্চিত্রের বাইরে নিজের জন্য গান গাওয়া ও সুর তৈরি করাকে তিনি সঙ্গীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন।
এই জায়গা থেকেই উঠে এসেছে প্লেব্যাক বনাম নিজস্ব সঙ্গীতের প্রশ্ন। চলতি বছরের শুরুতে অরিজিৎ সিংহ (Arijit Singh) প্লেব্যাক থেকে সরে গিয়ে নিজের মতো করে সঙ্গীতচর্চার দিকে মন দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। আকৃতি মনে করেন, সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি শিল্পীর নিজস্ব পরিচয় খোঁজার চেষ্টা রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘প্লেব্যাক করলে সারা জীবন প্লেব্যাক গায়িকা হিসাবেই পরিচয় থেকে যেতে পারে। কিন্তু নিজে সঙ্গীত সৃষ্টি করলে মানুষ শিল্পী হিসেবে মনে রাখবে।’ বাংলা গানের সঙ্গে আকৃতির সম্পর্ক অবশ্য শুধু পেশাগত নয়। তাঁর বাংলা গানের যাত্রার শুরু নিয়েও রয়েছে দুর্গাপুজোর একটি স্মৃতি। মুম্বইয়ের একটি পুজোমণ্ডপে গান গাওয়ার সময় তাঁর কণ্ঠ শুনেছিলেন চন্দ্রাণী গঙ্গোপাধ্যায় (Chandrani Ganguly), যিনি সঙ্গীত পরিচালক জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের (Jeet Gannguli) স্ত্রী। পরে জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজের সুযোগ আসে। ‘পাগলু’ ছবির গান দিয়েই বাংলা চলচ্চিত্রে আকৃতির নিয়মিত যাত্রা শুরু হয়। তারও আগে বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল গুরু ব্যোমকেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Byomkesh Bandopadhyay) হাত ধরে। গানের তালিমে তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে আটকে থাকেননি। গজল, ভজন, ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতি সহ বিভিন্ন ধারার সঙ্গে পরিচিত করেছেন তাঁর গুরু। বাংলা ভাষা না বুঝলেও গানের কথা বুঝে নেওয়ার জন্য গুরু তাঁকে সাহায্য করতেন। ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ এবং ‘বড় আশা করে এসেছি গো’-র মতো রবীন্দ্রসঙ্গীতও সেই সময় শিখেছিলেন আকৃতি। আজও সুযোগ পেলে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে থাকেন তিনি। ফলে বাংলা গানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কেবল চলচ্চিত্রের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয়নি; এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সঙ্গীতশিক্ষার পর্বও।
বর্তমান সময়ে গান জনপ্রিয় করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে রিল। কয়েক সেকেন্ডের কোনও অংশ ভাইরাল হয়ে রাতারাতি গান পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে একেবারে অস্বীকার করেন না আকৃতি। বরং সময়ের সঙ্গে শ্রোতার অভ্যাস বদলেছে বলে মনে করেন তিনি। তবে শুধুমাত্র রিলের জন্য গান তৈরি করার পক্ষপাতী নন। তাঁর মতে, একটি গানের সম্পূর্ণতা জরুরি। আজকের শ্রোতার হাতে সময় কম, তাই দীর্ঘ সময়ের গান সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, গানের মূল সৌন্দর্য বাদ দিয়ে শুধু কয়েক সেকেন্ডের ভাইরাল অংশ তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। আকৃতির কাছে জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শ্রোতাসম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিল্পীদের কাছে পৌঁছনোর পথও অনেক সহজ করে দিয়েছে। একসময় একটি গান মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে রেডিয়ো, টেলিভিশন কিংবা প্রচলিত প্রচারের উপর নির্ভর করতে হত। এখন নিজের গান সরাসরি শ্রোতার হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে আকৃতির মতে, একবার ভাইরাল হওয়া আর দীর্ঘদিন শ্রোতার মনে থেকে যাওয়া এক বিষয় নয়। একটি গানের মানই শেষ পর্যন্ত তার আয়ু নির্ধারণ করে। বাংলা ও হিন্দি, দুই ভাষাতেই কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আকৃতির। ‘স্যাটারডে’, ‘খুদায়া খৈর’, ‘ইসকী উসকী’-র মতো হিন্দি গানেও তাঁর কণ্ঠ জনপ্রিয় হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ছবির গান তাঁর কর্মজীবনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। কলকাতায় কাজ করতে এসে শহরের খাবারের প্রতিও তাঁর টান তৈরি হয়েছে। বিরিয়ানি থেকে বাসন্তী পোলাও, ভোগের খিচুড়ি, শুক্তো, আলু পোস্ত, মোচার ঘণ্ট, মাছের ঝোল এবং চিংড়ি মালাইকারি, বাঙালি খাবারের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে তাঁর পছন্দের মধ্যে।
ব্যক্তিগত জীবনেও গত কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন এসেছে আকৃতির। ২০২৩ সালে মা হয়েছেন তিনি। গান, রেওয়াজ এবং পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি সন্তান মেহরানের (Mehrann) বেড়ে ওঠাও এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ছেলের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীতের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। আকৃতির গান শুনলে তাঁর সন্তান নাচতে শুরু করে, এই ছোট ছোট মুহূর্তও গায়িকার কাছে বিশেষ আনন্দের। আকৃতির পরিবারেও সঙ্গীতের দীর্ঘ উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর দুই বোন প্রকৃতি কক্কড় (Prakriti Kakkar) ও সুকৃতি কক্কড় (Sukriti Kakkar) দু’জনেই সঙ্গীতশিল্পী। তিন বোনের পেশাগত ক্ষেত্র এক হলেও তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন আকৃতি। তাঁরা একে অপরের গান নিয়ে মতামত দেন, ভুল হলে জানান, আবার ভাল কাজ হলে পাশে দাঁড়ান। তিন বোনের এই সম্পর্ক নিয়ে আকৃতির বক্তব্য, ‘ভাইবোন হিসেবে আমাদের মধ্যে খুব ভাল বোঝাপড়া রয়েছে। কারও গান পছন্দ না হলে সেটাও আমরা একে অপরকে বলে দিই।’ তাঁর কাছে পরিবারের সাফল্য আলাদা কোনও প্রতিযোগিতা নয়।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সঙ্গীতজীবনে আকৃতি বুঝেছেন, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া এবং দীর্ঘ সময় শিল্পী হিসেবে টিকে থাকা এক জিনিস নয়। ২০০৪ সাল থেকে চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার যাত্রা শুরু তাঁর। এত বছরে বহু ভাষায় গান গেয়েছেন, রিয়্যালিটি শোয়ে বিচারকের আসনে থেকেছেন, নিজের গানও তৈরি করেছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য আরও একটু অন্য রকম, শুধু গলার পরিচয়ে নয়, নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে শ্রোতার মনে জায়গা করে নেওয়া। ২০ বছর আগের নিজের সঙ্গে যদি আজ দেখা হয়ে যেত, সেই তরুণ আকৃতিকে তিনি কী বলতেন? তাঁর উত্তরও যথেষ্ট সহজ। ‘অতিরিক্ত চিন্তা করার দরকার নেই। নিজের উপর অযথা চাপ নিও না। নিষ্ঠার সঙ্গে গান করে যাও।’ সেই পথেই এখনও এগোচ্ছেন আকৃতি কক্কড়। প্লেব্যাকের জনপ্রিয়তা তাঁর পরিচয়ের একটি অংশ, কিন্তু তাঁর সঙ্গীতযাত্রার শেষ ঠিকানা শুধু সিনেমার গান নয়। নিজের সুর, নিজের কণ্ঠ এবং নিজের অনুভূতি দিয়ে তৈরি গানেই ভবিষ্যতে তিনি আরও বড় পরিচয় খুঁজতে চান।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonakshi Sinha wedding, interfaith marriage story | বিয়ের স্মৃতিতে ধর্মের মেলবন্ধন! সোনাক্ষী সিন্হার মুখে উঠে এল গায়ত্রী মন্ত্র ও আজানের অনন্য মুহূর্ত




