সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei) -এর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক তৎপরতা ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন দিল্লি জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে ওই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করবেন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা (Pabitra Margherita) ও বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন (Syed Ata Hasnain)। যদিও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তবু তিনি তেহরানে যাচ্ছেন না। তাঁর পরিবর্তে এই দুই প্রতিনিধিই ভারতের উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন। ইরান সরকার জানিয়েছে, দীর্ঘ চার মাস পরে নিহত সর্বোচ্চ নেতার শেষকৃত্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন করা হবে। রাজধানী তেহরানে আগামী ৫ জুলাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হবে পাশাপাশি ৯ জুলাই তাঁর নিজ শহর মাশহাদে (Mashhad) দাফন সম্পন্ন হবে। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুধু ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক তাৎপর্যও প্রবল হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহলের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এই শেষকৃত্যকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিসরেও নজর কাড়ছে একটি আলাদা দিক। ইরান সরকার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে (Mallikarjun Kharge), প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সলমন খুরশিদ (Salman Khurshid) ও দলের মুখপাত্র পবন খেড়াকে (Pawan Khera) আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে তাঁরা আদৌ তেহরানে যাবেন কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি। খুরশিদ জানিয়েছেন, ‘আমন্ত্রণ এসেছে, তবে দলের তরফে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে, বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হবে।
খামেনেইয়ের মৃত্যু ঘিরে বিতর্কও কম নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের (Pentagon) তরফে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) চালানো হয়েছিল ইরানের বিরুদ্ধে। সেই অভিযানের দিনই নিহত হন আয়াতোল্লা। ওই হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সেনা আধিকারিকও প্রাণ হারান। যদিও তাঁদের দ্রুত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, খামেনেইয়ের শেষকৃত্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত রাখা হয়েছিল। এই বিলম্ব ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। সূত্রের খবর, সেই সময় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ছিল প্রধান উদ্বেগের বিষয়। আয়াতোল্লার পুত্র মোজতবা খামেনেইকে (Mojtaba Khamenei) অন্তর্বর্তীভাবে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হলেও তিনিও পরবর্তী সময়ে মার্কিন হামলায় গুরুতর আহত হন বলে জানা যায়। তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে নিহত নেতার দেহ কোথায় রাখা হয়েছিল, তা নিয়েও দীর্ঘদিন কোনও সরকারি তথ্য সামনে আসেনি। ফলে গোটা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক জল্পনা তৈরি হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলির একটি অংশ জানিয়েছে, নতুন নেতৃত্বের নিরাপত্তা ও ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত শেষকৃত্যের দিনক্ষণ ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি বড় আকারের জনসমাবেশের সম্ভাবনাও প্রশাসনের কাছে চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। অতীতে কমান্ডার কাসেম সোলেমানির (Qasem Soleimani) মৃত্যুর পরে যে বিশাল জনসমাগম হয়েছিল, তা এখনও ইরানের রাজনৈতিক স্মৃতিতে তাজা। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর সোলেমানির শোকযাত্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি নজির তৈরি করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই বিপুল জনসমাগম নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই শেষকৃত্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। গত ১৩ জুন তেহরান শেষকৃত্যের সময়সূচি ঘোষণা করে। সেই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং প্রেসিডেন্ট পেজ়েশকিয়ানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপরই ইরান সরকার শেষকৃত্যের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায়। ফলে এই শেষকৃত্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক অবস্থান আর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবেও উঠে এসেছে।
ভারতের প্রতিনিধিত্ব, কংগ্রেস নেতৃত্বের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের উপস্থিতি, এসব মিলিয়ে তেহরানে আয়োজিত এই শেষকৃত্য আগামী কয়েক দিনে বৈশ্বিক নজরের কেন্দ্রে থাকতে চলেছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে বিভিন্ন দেশ, কারণ এই ঘটনাকে ঘিরে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণও প্রভাবিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Iran Invites PM Modi to Khamenei Funeral | Burial in Mashhad Raises Global Focus : খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোদীকে তেহরানের আমন্ত্রণ, মাশহাদে সমাহিত হবেন ইরানের প্রভাবশালী নেতা, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নজর বিশ্বজুড়ে




