সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে, আর তার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে শিশুদের এক বিশাল অংশ। ইউনিসেফ (UNICEF) প্রকাশিত ‘চিলড্রেনস ক্লাইমেট রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’ (Children’s Climate Risk Report 2026) অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮.৯৩ কোটি শিশু তাপপ্রবাহ-প্রবণ এলাকায় বসবাস করছে। এই সংখ্যা মোট শিশু জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ, যা পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবাচ্ছে প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরকে। রিপোর্টে আরও জানানো হয়েছে, ভারতে প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ শিশু অন্তত একটি জলবায়ুজনিত বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রায় গোটা শিশুজনসংখ্যাই কোনো না কোনোভাবে আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এই তথ্য দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তাপপ্রবাহের পাশাপাশি খরার মতো সমস্যাও ব্যাপক আকার নিয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৪১ কোটি শিশু, যা মোটের ৯৬.২ শতাংশ, খরার প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। এই খরার মধ্যে কৃষিজ এবং আবহাওয়াজনিত, উভয় ধরনের পরিস্থিতিই অন্তর্ভুক্ত। ফলে খাদ্য উৎপাদন, পানীয় জলের প্রাপ্যতা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উপর এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে, যার অভিঘাত শিশুদের জীবনযাত্রায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। একইসঙ্গে, প্রায় ৩৯.২ কোটি শিশু, অর্থাৎ ৯২ শতাংশ, চরম তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করছে। এখানে চরম তাপমাত্রা বলতে এমন দিনকে বোঝানো হয়েছে, যখন তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের তাপমাত্রা শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনিসেফ-এর তরফে জানানো হয়েছে, ‘ভারতের শিশুদের একটি বড় অংশ বহুস্তরীয় জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করছে।’ এই তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবেও উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে গ্রামীণ এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলির শিশুরা। কারণ, এই সব অঞ্চলে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব তাদের উপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে। তাপপ্রবাহের প্রভাবে স্কুলে উপস্থিতির হার কমে যাওয়া, পানীয় জলের অভাব, এবং বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও সামনে আসছে। শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব একটা ভিন্ন নয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে, যা শিশুদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থানীয় স্তর থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। সরকারী ও বেসরকারী স্তরে ইতিমধ্যেই কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা পর্যাপ্ত নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুলে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি, এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন, এই বিষয়গুলিতে জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের এক বড় অংশ, যারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের উপর নির্ভরশীল।
উল্লেখ্য, ভারতের মতো জনবহুল দেশে এই ধরনের পরিস্থিতি সামলানো নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এই রিপোর্ট সামনে আসার পর থেকেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শিশুদের সুরক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন বলেই মত প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন স্তরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Diet, Anushka Sharma Vegan | অনুষ্কার প্রভাবে বিরাট কোহলির ডায়েট বদল, আমিষ ছেড়ে এখন কী খান ক্রিকেট তারকা



