সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তাপমাত্রা বাড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে রেখে পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) -এর সরকারকে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন। রবিবার নিউ টাউন কনভেনশন সেন্টারে (New Town Convention Centre) আয়োজিত বিজেপির (BJP) বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানেই হাত দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই অনিয়মের চিহ্ন মিলছে। পরিস্থিতি এমন যে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড (Brigade Parade Ground) জেল বানাতে হবে।’ নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে তাঁর সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একাধিক প্রকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম সামনে আসছে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা যে কাজই শুরু করছি, সেখানেই দুর্নীতির চিত্র সামনে আসছে। তাই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের সুফল আগামী কয়েক দশক ধরে রাজ্যের মানুষ পাবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানো এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উল্লেখ, আসে লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lakshmir Bhandar) প্রকল্পের প্রসঙ্গ। পূর্বতন সরকারের এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুলে শুভেন্দু বলেন, ‘আগে ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ এই সুবিধা পেতেন। কিন্তু যাচাই করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, ২৭ লক্ষ নাম এমন রয়েছে যাদের ভোটার তালিকায় অস্তিত্বই নেই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এর পাশাপাশি প্রায় ৩ লক্ষ পুরুষের নামও পাওয়া গিয়েছে যারা এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী ছিলেন।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, বিভিন্ন জেলায় এই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। তাঁর কথায়, ‘মুর্শিদাবাদে কয়েক হাজার এবং কৃষ্ণনগরের একটি এলাকায় কয়েকশো এমন নাম পাওয়া গিয়েছে। এই চিত্র ভয়াবহ।’ এই উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করতেই নতুনভাবে প্রকল্পগুলিকে সাজানো হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana) -এর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই প্রকল্প চালুর সময় সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু এখন মানুষ বুঝতে পারছেন যে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার কতটা জরুরি। ‘ট্যাক্সের টাকা নষ্ট করা যায় না, সেই জায়গা থেকেই আমরা নতুন ব্যবস্থা নিয়েছি,’ বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, ‘যেখানে হাত দিচ্ছি, সেখান থেকেই পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। চাইলে কেউ নবান্নে (Nabanna) এসে সময় নিয়ে সব দেখতে পারেন।’ তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। শুধু বিরোধীদের আক্রমণেই থেমে থাকেননি শুভেন্দু অধিকারী। দলের কর্মীদের উদ্দেশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় এসেছি বলে অহংকারের জায়গা তৈরি করা যাবে না। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, রাজ্যের মানুষ তাঁদের উপর বড় দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই আস্থা বজায় রাখাই এখন প্রধান কাজ। তিনি আরও বলেন, ‘আগেও বলেছিলাম, আমি নয়, আমরা। সেই ভাবনাই সামনে রেখে এগোতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সংগঠনের ভিত মজবুত করতে হবে।’ তাঁর বক্তব্যে দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
সরকারি প্রকল্প বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, তা নজরে রাখার নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সঙ্কল্পপত্রে যে প্রতিশ্রুতিগুলি দেওয়া হয়েছিল, তার কিছু ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ৩১৫ জন দলীয় কর্মীর স্মৃতিতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ এবং তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল (Chief Minister Relief Fund) থেকে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়েও বক্তব্য রাখেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, বিএসএফ (BSF)-এর জন্য জমি হস্তান্তরের কাজ শুরু হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৫৫৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১০০ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর করা হয়েছে। একইসঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘যারা এখানে অবৈধভাবে ছিল, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে পাঠানো হয়েছে।’
আগামী দিনে জনগণনা প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তারিত জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১ অগস্ট থেকে বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা শুরু হবে, যা চলবে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত। এরপর ১৬ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিবারের সদস্যসংখ্যা গণনা করা হবে। এই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে ডিলিমিটেশন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সময়ে জাতিভিত্তিক গণনাও শুরু হবে বলে জানান তিনি। রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক কৌশল, সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে এনে এই বৈঠকে একাধিক বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্যে যেমন পূর্বতন সরকারের সমালোচনা ছিল, তেমনই বর্তমান প্রশাসনের ভবিষ্যৎ রূপরেখার ইঙ্গিতও মিলেছে। রাজ্য রাজনীতিতে এই বক্তব্যের প্রভাব আগামী দিনে কতটা পড়বে, তা নিয়েই এখন জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Tajpur Port West Bengal | তাজপুর থেকে সরে দাদনপাত্রবাড়, গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে নতুন মোড়, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বড় প্রস্তাব ঘিরে চর্চা




