সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নয়া দিল্লি/বর্ধমান: পূর্ব দিল্লির বহুল আলোচিত অধ্যাপিকা হত্যাকাণ্ডে নাটকীয় অগ্রগতি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পাল (Debasmita Paul) খুনের ঘটনায় বর্ধমান (Bardhaman) থেকে এক দম্পতিকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ (Delhi Police)। স্থানীয় বর্ধমান পুলিশের সহায়তায় টাউন এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসছে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধই এই হত্যার মূল কারণ হতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ, যাতায়াতের খুঁটিনাটি এবং ঘটনার আগে-পরে আচরণ এক সুপরিকল্পিত ছকের ইঙ্গিত পাচ্ছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভ (Vasundhara Enclave) -এর সত্যম অ্যাপার্টমেন্ট (Satyam Apartment) থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় দেবস্মিতা পালের দেহ। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মাথায় আঘাত এবং হাতের শিরা কেটে খুন করা হয়েছে তাঁকে। ঘটনাস্থলে তিনি একাই ছিলেন। তাঁর স্বামী বেঙ্গালুরুতে (Bengaluru) কর্মসূত্রে থাকেন, ফলে ওই দিন ফ্ল্যাটে অন্য কেউ ছিলেন না, এই তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
তদন্তের শুরুতেই সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ কিছু সন্দেহজনক নড়াচড়া লক্ষ্য করে। ফুটেজে দেখা যায়, এক দম্পতি মুখে মাস্ক পরে, সঙ্গে কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকছেন। তাঁরা লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠেন। প্রায় আধঘণ্টা পরে একই দম্পতিকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়, তবে তখন তাঁদের পোশাকে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পুলিশের দাবি, ‘প্রবেশ ও বেরোনোর সময় পোশাক বদল, এই বিষয়টি পরিকল্পনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।’ ধৃতদের নাম রামপ্রসাদ দাস (Ramprasad Das) এবং বনশ্রী দাস (Banshree Das)। দু’জনেই বর্ধমানের বাসিন্দা। তাঁদের নাবালক ছেলেকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, কারণ ঘটনার সময় সে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ মনে করছে, সন্দেহ এড়াতেই অভিযুক্তরা সন্তানের উপস্থিতিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। ‘একটি পরিবার হিসেবে ঢোকা-বেরোনো নজর এড়ানোর কৌশল হতে পারে’ তদন্তকারী এক আধিকারিকের এমন মন্তব্য সামনে এসেছে।
পুলিশ আরও জানায়, অভিযুক্তরা ক্যাব ভাড়া করে অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছেছিলেন। পরে একইভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট ট্যাক্সিচালককেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। যাতায়াতের রুট, সময় এবং যোগাযোগের সূত্র ধরে ঘটনার পূর্ণ চিত্র গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। খুনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা আরও চাঞ্চল্যকর। দেবস্মিতা পালের পরিবারের একটি মূল্যবান সম্পত্তি ছিল, যার মধ্যে একটি বাড়ি ওই দম্পতির দখলে ভাড়াটে হিসেবে ছিল। অভিযোগ, সেই বাড়ির উপর স্থায়ী দখল নেওয়ার ইচ্ছা থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। দেবস্মিতা ওই বাড়ি খালি করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন বলেও জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের অনুমান, ‘সম্পত্তি সংক্রান্ত টানাপোড়েন থেকেই এই ঘটনা ঘটতে পারে।’ এই সূত্র ধরেই দিল্লি পুলিশ বর্ধমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। যৌথ অভিযানে দম্পতিকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ট্রানজিট রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে বলে জানা গিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই দুই রাজ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। দিল্লির মতো শহরে একা থাকা একজন অধ্যাপিকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আন্তঃরাজ্য অপরাধ দমনে পুলিশের সমন্বয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্ধমান থেকে দিল্লি গিয়ে অপরাধ সংঘটিত করার বিষয়টি তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, ডিজিটাল প্রমাণ এবং ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করছেন। অভিযুক্তদের চলাফেরা, যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেন, সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের মতে, ‘ঘটনার আগে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা বিভিন্ন সূত্রে মিলছে।’ তবে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি, ঠিক কীভাবে খুনের মুহূর্তটি ঘটেছে, কী কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, এবং অন্য কেউ জড়িত কি নাএসব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই মামলার অগ্রগতির দিকে এখন নজর রয়েছে দেশজুড়ে। কারণ, এটি শুধু একটি খুনের ঘটনা নয়, বরং সম্পত্তি বিরোধ, আন্তঃরাজ্য চলাচল এবং পরিকল্পিত অপরাধ, এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধারায় মামলা গঠন হয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দেবস্মিতা পালের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তাঁর সহকর্মী ও পরিচিত মহলে। একই সঙ্গে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও উঠছে। তদন্ত যত এগোবে, ততই এই রহস্যের আরও স্তর উন্মোচিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Delhi hotel fire 21 dead | দিল্লির মালব্যনগরে হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: ২১ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু, আতঙ্কে জানলা থেকে ঝাঁপ অতিথিদের, চলছে জোরদার উদ্ধার




