সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: নবান্নের প্রশাসনিক বৈঠকের পরেই কলকাতা পুরসভাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম (Firhad Hakim) তাঁর পদ ছাড়তে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress) সূত্রে খবর ছড়িয়েছে। দলের শীর্ষনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)। যদিও এই বিষয়ে ফিরহাদ নিজে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি, তবু রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে। বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে নবান্নে গিয়েছিলেন তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফিরহাদ হাকিমও। বৈঠক শেষে তিনি কলকাতা পুরসভায় ফিরে এসে মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা জানান বলে দলীয় সূত্রের দাবি। এই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, শহরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে কী বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে?
কুণাল ঘোষ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুরসভায় কাজের পরিবেশ এখন অনুকূল নয়। সেই বিষয়টি নেত্রীকে জানানো হয়েছিল।’ তাঁর কথায়, প্রথমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানান। কিন্তু ফিরহাদ হাকিম নাকি ‘সম্মানের সঙ্গে অব্যাহতি’ চেয়েছেন। এরপরেই তিনি সম্মতি দেন বলে দাবি কুণালের। এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই কলকাতা রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে। ফিরহাদ হাকিম দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের প্রশাসনিক এবং পৌর রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ২০১৮ সালের নভেম্বরে কলকাতার মেয়র পদে বসেন তিনি। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পুরসভার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালেও পুনরায় মেয়রের আসনে বসেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিত্ব ও মেয়র পদ সামলানোর নজিরও তৈরি করেছিলেন। প্রায় আট বছর ধরে এই দ্বৈত দায়িত্ব সামলানোর পর হঠাৎ তাঁর ইস্তফার জল্পনা পরিস্থিতিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সাম্প্রতিক একাধিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন। মঙ্গলবারই কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (নিকাশি) পদ থেকে ইস্তফা দেন তারক সিংহ (Tarak Singh)। তিনি দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘কর্মী ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।’ পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরসভার ভেতরে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠছে। এই মন্তব্যের পরেই পুর প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তারক সিংহের পদত্যাগের পর ফিরহাদ হাকিম বলেছিলেন, ‘আমরা দল হিসেবে একসঙ্গে কাজ করি, সিদ্ধান্তও একসঙ্গে নেওয়া হয়।’ সেই বক্তব্যের পরদিনই তাঁর নিজের ইস্তফার সম্ভাবনা ঘিরে আলোচনা শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কৌতূহল বেড়েছে। বুধবার দিনটি তৃণমূলের জন্য ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। একই দিনে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উঠে আসেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলের ভিতরে বিভাজন আরও সামনে আসে। পাশাপাশি দলের সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তও ঘোষণা করা হয়। জানানো হয়, কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে খারাপ ফল এবং তার পরবর্তী অস্থিরতার আবহে দলকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ছাত্র, যুব, শ্রমিক এবং মহিলা সংগঠনগুলিকে নতুন কাঠামোয় নিয়ে আসার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee), কুণাল ঘোষ এবং চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya)। দলের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়েই এই আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। একই সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ইডি (Enforcement Directorate) -এর নোটিস পৌঁছনোর ঘটনাও নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। নিয়োগ সংক্রান্ত মামলার সূত্রেই এই পদক্ষেপ বলে জানা যাচ্ছে। এই বহুমুখী ঘটনার আবহে ফিরহাদ হাকিমের সম্ভাব্য ইস্তফা বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে। কলকাতা পুরসভা, যা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা সামনে আসায় রাজনৈতিক চর্চা আরও তীব্র হয়েছে। শহরের প্রশাসনিক কাজে এর প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। ফিরহাদ হাকিম নিজে মুখ না খোলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের অন্দরে চলতে থাকা এই পরিবর্তনের আবহে আগামী কয়েক দিন রাজ্য রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee protest | ধর্মতলায় ধর্না বনাম তারকেশ্বর কটাক্ষ : মমতা-শুভেন্দু সংঘাতে তপ্ত রাজ্য রাজনীতি




