সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিধানসভা নির্বাচনে বড় ধাক্কার পর প্রায় ২৮ দিন রাজনৈতিক ময়দানে সরাসরি কর্মসূচি থেকে দূরে থাকার পরে ফের রাজপথে নামলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কলকাতার ধর্মতলায় ধর্নামঞ্চে দাঁড়িয়ে সংবিধান হাতে তুলে নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করেন তিনি। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন তরজা। একই দিনে হুগলির তারকেশ্বর থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) তৃণমূলের অবস্থান নিয়ে কড়া কটাক্ষ করেন, যা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। ধর্মতলার ধর্নায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় শাসক দলের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দলের কঠিন সময়ের প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, ‘আমি কারও সুদিনে না-হোক, দুর্দিনে আছি।’ নিজের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে মমতা জানান, ‘বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম… জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হটাকে যায়েঙ্গে।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে পরিষ্কার বার্তা, বিজেপিকে সরানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের ফলাফলের পর দলের সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে এই ধর্না কর্মসূচী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এই কর্মসূচির জনসমাগম এবং দলের অভ্যন্তরীণ উপস্থিতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী শিবির। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার হুগলি সফরে গিয়ে তারকেশ্বর মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ধর্মতলার ধর্না নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ‘একজন ছবি পাঠিয়েছিল… এত দুরবস্থা আমি জানতাম না! একঝুড়ি লোক… দেড়শোটা লোকও আসেনি। সাংবাদিকরাই ছিলেন দু’শো জন মতো। সাংবাদিকেরা না থাকলে তো আরও করুণ অবস্থা হত।’ তাঁর এই মন্তব্যে তৃণমূল শিবিরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, তৃণমূলের সাংসদ এবং বিধায়কদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘রাজ্যসভা, লোকসভা মিলিয়ে এতগুলো এমপি। শুনলাম, তিন জন এমপি আর ছ’জন এমএলএ গিয়েছেন। ওই দলটার অবস্থা ফলতার মতো হয়ে গিয়েছে।’ সদ্যসমাপ্ত ফলতা উপনির্বাচনের ফলাফলকে সামনে এনে তিনি তৃণমূলের সংগঠনগত দুর্বলতা তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
তারকেশ্বর সফরে শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। মন্দিরে পুজো দেওয়ার পর তিনি দলীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে জানান, তারকেশ্বর উন্নয়ন পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, এডিএম অনুজ প্রতাপ সিংহকে (Anuj Pratap Singh) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তারকেশ্বর ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) ও প্রধান সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হবে। সামনে শ্রাবণ মাসকে কেন্দ্র করে যে বিশাল সংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়, তার জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি জোরদার করার কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘শ্রাবণী মেলাকে কেন্দ্র করে এ বার সরকার থেকে বাবা তারকনাথের পবিত্রভূমিতে যত পুণ্যার্থী আসবেন, তাঁদের জন্য বড় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
মন্দির চত্বরের সৌন্দর্যায়ন নিয়েও মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘পবিত্র দুধপুকুর পাড়ে কী সব রং করে রেখেছে! রঙ পরিবর্তন আগে করা দরকার। আধ্যাত্মিকতা এবং আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই রং প্রয়োজন।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন কাজের ইঙ্গিত দেন তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১ জুন পূর্বতন সরকার তারকেশ্বর উন্নয়ন পরিষদ বা টিডিএ গঠন করেছিল। সেই সময় চেয়ারম্যান করা হয়েছিল ফিরহাদ হাকিমকে (Firhad Hakim), যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসনের দাবি, গত কয়েক বছরে কিছু উন্নয়ন হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে নতুন করে পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিকে ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না এবং তারকেশ্বর থেকে শুভেন্দুর পাল্টা কটাক্ষ, এই দুই ঘটনাকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। একদিকে তৃণমূল নিজেদের সংগঠন মজবুত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শাসক দল বিরোধীদের দুর্বলতা তুলে ধরতে সক্রিয়। রাজনৈতিক সংঘাতের এই নতুন অধ্যায় আগামী দিনে কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়েই নজর রয়েছে সাধারণ মানুষের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee case, post poll violence West Bengal Calcutta High Court | ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে হাই কোর্টে তোলপাড়: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় -এর সওয়ালে কড়া নির্দেশ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রতি বার্তা



