সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের ধাক্কার পর তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) -এর অন্দরে অস্বস্তি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। পূর্বনির্ধারিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রায় ৬০ জন বিধায়কের অনুপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে উঠে এল কড়া অভিযোগ। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সরাসরি দাবি করেছেন, ‘টাকা ছড়িয়ে ও ভয় দেখিয়ে’ তাঁর দলের বিধায়ক ও সাংসদদের ভাঙানোর চেষ্টা চলছে। এর পেছনে বিজেপি -র ভূমিকা রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। কালীঘাটে দলীয় কার্যালয়ে বৈঠকের পরে মমতা বলেন, ‘আমাদের বিধায়ক-সাংসদদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রথমে পুলিশ সূত্রে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তারপর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের তরফে ফোন যাচ্ছে।’ তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, দলের মধ্যেই কিছু নেতা ‘বিশ্বাসঘাতকতার পথ’ বেছে নিয়েছেন।
এই বিতর্কের মধ্যেই সোমবার দলবিরোধী কাজের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) এবং সন্দীপন সাহাকে (Sandipan Saha)। দলের সহ-সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (Chandrima Bhattacharya) আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের প্রাথমিক সদস্যপদ খারিজের কথা জানান। এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে নাম না করে ঋতব্রতকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘একজন নীতিহীন মানুষ। এই একটি বিষয়ে অন্তত সিপিএম (CPM)-কে কৃতিত্ব দিতেই হয়, ওরা আগে ওকে সরিয়ে দিয়েছিল। আমরা সুযোগ দিয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজে অন্য একজনের টিকিট কেটে ওকে প্রার্থী করেছিলাম। আজ সেই সিদ্ধান্তের জন্য মানুষের কাছে ক্ষমা চাইছি।’
দলীয় বৈঠকে বিপুল সংখ্যক বিধায়কের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই মমতা জানান, ‘আমি নিয়মিত কালীঘাটে বসছি। যাঁরা বলছেন কথা বলার সুযোগ নেই, তাঁরা অজুহাত খুঁজছেন।’ তাঁর মতে, অনেকেই এখন ক্ষমতার পালাবদলের আশঙ্কায় নিজেদের অবস্থান বদলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘পার্টির টিকিটে জিতে ক্ষমতা ভোগ করেছেন, এখন পরিস্থিতি বদলাতেই অন্য শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।’ মমতা আরও অভিযোগ করেন, কিছু নেতা নিজেদের স্বার্থে দল ছেড়ে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। তাঁর কথায়, ‘কেউ বলছেন সম্পত্তি বাঁচাতে হবে, কেউ বলছেন পুলিশ ধরবে। কিন্তু হাজার হাজার কর্মী যারা লড়াই করে, তাঁদের কথা কি কেউ ভাবছেন?’ তিনি তৃণমূলের কর্মীদের ত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘কর্মীরা ভয় পান না, লড়াই করেন। নেতৃত্বের একাংশ সেই সাহস দেখাচ্ছেন না।’
এই প্রেক্ষাপটে তিনি দলের কর্মী ও সমর্থকদের একজোট থাকার বার্তা দেন। পাশাপাশি দলত্যাগের পথে হাঁটতে চাওয়া নেতাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন। মমতা বলেন, ‘যাঁরা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা যেন এটা না বলেন যে, দলের কেউ তাঁদের কথা শোনেনি। আমরা প্রতিদিন অভিযোগ শুনেছি, সাহায্য করেছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘টাকার লোভ বা ভয় দেখিয়ে যদি কেউ দল ভাঙার চেষ্টা করেন, সেটা সফল হবে না। আমি জানি কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়।’ এদিনের বক্তব্যে মমতা তাঁর পরিবারের সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) -এর প্রসঙ্গও টেনে আনেন। তিনি বলেন, ‘একজন তরুণ নেতাকে আক্রমণ করা হয়েছে, কিন্তু সে মাথা নোয়ায়নি।’ একই সঙ্গে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)-এর উপর হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক মহলে এই বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা এই অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক নাটক’ বলে কটাক্ষ করলেও তৃণমূলের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়েছে, দল ভাঙানোর চেষ্টা নতুন নয়। বরাবরই এ ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
৬০ বিধায়কের অনুপস্থিতি নিয়ে এখনও পরিষ্কার ব্যাখ্যা না মিললেও, এই ঘটনা যে দলের ভিতরে অসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বহিষ্কারের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আগামী দিনে আরও কেউ দল ছাড়বেন কি না, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। একদিকে বিরোধীদের চাপ, অন্যদিকে দলীয় ভাঙনের আশঙ্কা, এই দুইয়ের মাঝে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : RG Kar Case Update Bengal | আরজি কর কাণ্ডে বড় পদক্ষেপ: তিন আইপিএস সাসপেন্ড, মমতার ভূমিকা নিয়েও তদন্তের ইঙ্গিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর




