সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্য রাজনীতির নতুন অধ্যায়ে বিধানসভা চত্বরে এক অভিনব চিত্র দেখা গেল। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আবহে রাজনৈতিক ভাষণের বাইরে উঠে এল খাদ্যসংস্কৃতির অনুষঙ্গ। শপথ নিতে যাওয়া বিজেপি (BJP) বিধায়কদের জন্য মধ্যাহ্নভোজে সাজানো হল একেবারে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মেনু মাছ-ভাত। এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা প্রোটেম স্পিকার তথা মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায় (Tapas Roy), তিনি নিজের উদ্যোগেই এই বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের পরিকল্পনা করেন।
আরও পড়ুন : Samik Bhattacharya | ‘এটি বিজেপি সরকার নয়’ : শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠকের পর বড় বার্তা শমীক ভট্টাচার্যের
বিধানসভা ভবনের ভেতরে এই মেনু ঘোষণার সময় তাপস রায়ের মুখে ছিল হালকা হাসি। রাজনৈতিক অঙ্গনে যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেরই আলাদা তাৎপর্য থাকে, সেখানে মাছ-ভাত পরিবেশনের বিষয়টি নিছক খাবারের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং তা হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক অবস্থানের এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত। এর আগে ৪ মে ভোটের ফলাফল প্রকাশের দিনেও সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য দফতরে একই ধরনের মেনুর আয়োজন করা হয়েছিল। সেই দিনও উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের জন্য মাছ-ভাত পরিবেশন করা হয়। ধারাবাহিক ভাবে এই মেনু বেছে নেওয়ার পিছনে একটি নির্দিষ্ট ভাবনা কাজ করছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদের তরফে বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে দলটি বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে মাছ ও মাংস খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ভোটের প্রচারে একাধিকবার বলেছিলেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির অস্মিতা ক্ষুণ্ণ হবে, মাছ-মাংস খাওয়া নিয়েও বিধিনিষেধ আসতে পারে।’ এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। পাল্টা হিসেবে বিজেপি নেতৃত্ব বারবার জানাতে চেয়েছে যে এই অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। ভোটের সময় সেই অবস্থানকে সামনে রেখে বহু বিজেপি প্রার্থীকে মাছ হাতে নিয়ে প্রচার করতে দেখা গিয়েছিল। জনসংযোগের ক্ষেত্রে এটি এক ভিন্ন কৌশল হিসেবে নজর কাড়ে। উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, দলটি বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) নিজেও নির্বাচনী সভায় এসে মাছ প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন, যা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই বিজেপির এই কৌশল আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সল্টলেকের দফতরে মাছ-ভাতের আয়োজন এবং তার পর বিধানসভায় একই মেনুর পুনরাবৃত্তি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক বার্তা, যা ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলীয় অবস্থানকে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস।
বুধবার বিধানসভায় শপথগ্রহণের দিন উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas)-সহ বিভিন্ন জেলার নবনির্বাচিত বিধায়কেরা উপস্থিত ছিলেন। শপথের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের এই আয়োজন ছিল বিশেষ আকর্ষণ। সাধারণত এই ধরনের অনুষ্ঠানে নিরামিষ বা সাধারণ খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও, মাছ-ভাত পরিবেশন নিঃসন্দেহে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিজেপি একাধিক স্তরে বার্তা দিতে চেয়েছে। একদিকে যেমন বিরোধীদের অভিযোগের জবাব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করার প্রয়াসও দেখা যাচ্ছে। বাঙালির কাছে মাছ-ভাত শুধু খাদ্য নয়, এটি এক ধরনের পরিচয়, সেই পরিচয়ের সঙ্গেই নিজেদের মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বলেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এই উদ্যোগকে। তাপস রায় এই প্রসঙ্গে সরাসরি বড় কোনও মন্তব্য না করলেও তাঁর হাসি এবং আয়োজনের ধরন অনেক কিছুই ইঙ্গিত করছে বলে মনে করছেন উপস্থিত অনেকে। রাজনৈতিক মঞ্চে যেখানে প্রতিটি প্রতীক ও পদক্ষেপের আলাদা গুরুত্ব থাকে, সেখানে এই মধ্যাহ্নভোজ নিছক আপ্যায়নের গণ্ডি ছাপিয়ে এক বৃহত্তর অর্থ বহন করছে।
রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই ধরনের সাংস্কৃতিক ইঙ্গিত যে ভবিষ্যতের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না। খাদ্যসংস্কৃতির মতো সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে এই আয়োজন এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এল। বিধানসভা চত্বরে এ দিনের এই দৃশ্য অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকল। রাজনীতির ময়দানে যেখানে মতাদর্শের সংঘাত প্রতিদিনের ঘটনা, সেখানে মাছ-ভাতের মতো এক সাধারণ বিষয়ও যে বড় বার্তা বহন করতে পারে, তারই সাক্ষী রইল কলকাতা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Cabinet Portfolio, Bengal BJP Government | পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভায় দফতর বণ্টন: কার হাতে কোন দায়িত্ব দিলেন শুভেন্দু অধিকারী




