সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পিছনে রেখে নতুন সিদ্ধান্ত নিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নন্দীগ্রাম (Nandigram) যাকে তিনি বহুবার নিজের ‘ভদ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছেন, সেই কেন্দ্রের বিধায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। বিধানসভার নিয়ম মেনে ভবানীপুর (Bhabanipur) কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন তিনি, যার ফলে নন্দীগ্রাম আসনটি এখন শূন্য হয়ে গেল। রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, নন্দীগ্রাম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, বরং শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থানের এক প্রতীক। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। সেই আন্দোলনই তাঁকে রাজনীতির প্রথম সারিতে এনে দেয়।
২০১৬ সাল থেকে নন্দীগ্রামের বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন শুভেন্দু। পরবর্তী সময়েও এই কেন্দ্র তাঁর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে একসঙ্গে দুটি কেন্দ্র, নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন তিনি। নিয়ম অনুযায়ী, একজন প্রার্থী একাধিক আসনে জিতলে একটি আসন ছাড়তে হয়। সেই নিয়ম মেনেই এই সিদ্ধান্ত। বিধানসভায় শপথ গ্রহণের সময় শুভেন্দু ভবানীপুর কেন্দ্রকেই বেছে নেন। ফলে আনুষ্ঠানিক ভাবে তিনি নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই তিনি নন্দীগ্রামে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তাঁদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘বিধায়ক পদ ছাড়ছি ঠিকই, কিন্তু নন্দীগ্রামের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনও শেষ হবে না।’ এই মন্তব্য ঘিরেই তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক তাৎপর্য। অনেকেই মনে করছেন, নন্দীগ্রামকে ছেড়ে দিলেও ভবিষ্যতে এই কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংযোগ বজায় থাকবে। কারণ এই অঞ্চল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
অন্য দিকে, ভবানীপুর কেন্দ্রটি বেছে নেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। কলকাতার এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যের শাসক হিসেবে শহরকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নন্দীগ্রাম আসনটি এখন শূন্য হওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কোন প্রার্থীকে সেখানে নামানো হবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিজেপি (Bharatiya Janata Party) এই আসন ধরে রাখতে চাইবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্মৃতি এখনও রাজ্যের মানুষের মনে জাগরূক। সেই আন্দোলনের সময় জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায় যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছিল। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সেই আন্দোলন একসময় তীব্র আকার নেয় এবং তা রাজ্য রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে নন্দীগ্রাম ছাড়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা আবেগের সঙ্গেও জড়িত। বহু বছর ধরে এই কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু, বিধানসভা নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। দুটি আসনেই জয়ী হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি আসন ছাড়তেই হত। সেই বাধ্যবাধকতার কারণেই এই পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভবানীপুর কেন্দ্র বেছে নেওয়ার ফলে শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ আরও মজবুত হবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ করতে গেলে রাজধানী কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন, এই দিকটিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন নজর থাকবে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের দিকে। এই কেন্দ্রটি আবারও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শুভেন্দুর অনুপস্থিতিতে সেখানে দলের সংগঠন কীভাবে কাজ করে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। একদিকে আবেগ, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতি, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। আগামী দিনে এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুরে শুভেন্দুর এই যাত্রা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee chair, Suvendu Adhikari decision | মমতার চেয়ারে বসতে নারাজ শুভেন্দু, বিধানসভায় নতুন বিতর্ক



