সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: নতুন সরকারের শপথের পরই প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে জল্পনার আবহে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান জানালেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) -এর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানিয়ে দেন, ‘সরকার সরকারের মতো চলবে, দল দলের মতো’। তাঁর আরও সংযোজন, ‘এটি কোনও বিজেপি সরকার নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার’। এই মন্তব্য ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার সকালে রাজনৈতিক এই সাক্ষাৎ ঘিরে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে। নবান্নে (Nabanna) মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের আগে শুভেন্দু অধিকারী নিজেই শমীক ভট্টাচার্যের বাড়িতে যান। সেখান থেকে তাঁরা একসঙ্গে সল্টলেকের বিজেপি রাজ্য দফতরে পৌঁছন। বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী নবান্নের উদ্দেশে রওনা দেন। আর সেই বৈঠকের পরই সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে শমীক ভট্টাচার্য সরকারের ভূমিকা ও দলের অবস্থান নিয়ে পরিষ্কার কথা বলেন। শমীকের বক্তব্য, ‘সরকারের কাজে দল কোনও হস্তক্ষেপ করবে না’। একই সঙ্গে তিনি জানান, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করবে দল। বিশেষ করে আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat), মহিলা ভাতা ও বেকার ভাতার মতো প্রকল্প দ্রুত চালু করার বিষয়ে সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন প্রধান কাজ’। এই অবস্থানকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে মনে করা হচ্ছে, সরকার ও দলের ভূমিকা আলাদা করে দেখানোর মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে নেতৃত্ব। শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে নিয়ম ও সংবিধান মেনে কাজ করার বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যেও একই সুর ধরা পড়ে। তিনি জানান, নতুন সরকার পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করবে এবং সকলকে সঙ্গে নিয়েই এগোবে। তাঁর কথায়, ‘মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন, এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে’। তিনি সংবিধানপ্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেডকর (B. R. Ambedkar) -এর ‘for the people, by the people, of the people’ দর্শনের কথাও উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, গত শনিবার ব্রিগেড ময়দানে (Brigade Parade Ground) রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দিনটি ছিল ২৫শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) -এর জন্মজয়ন্তী। শপথ গ্রহণের পরই তিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে কবিগুরুকে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে দাঁড়িয়েই তিনি বলেন, ‘আমি এখন সবার মুখ্যমন্ত্রী’। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সামাজিক সম্প্রীতি ও উন্নয়নের কথা। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলার অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, এখন সময় নবনির্মাণের’। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত থেকে সরে এসে উন্নয়নমুখী প্রশাসনের দিকে এগোনোর ডাক দেন। তাঁর কথায়, ‘এখন আর রাজনৈতিক কচকচানির সময় নয়, আমাদের এগোতে হবে’। এই মন্তব্যও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন বার্তা বহন করছে।
শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই ভাবনারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। দল ও সরকারের পৃথক ভূমিকা তুলে ধরে তিনি জানাতে চেয়েছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনও চাপ থাকবে না। এতে আমলাতন্ত্রের কাজের পরিসর আরও স্বাধীন হতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে অনেকে মনে করছেন, এই অবস্থান আগামী দিনে রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, এই সব ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের কাঠামো কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরও এই বক্তব্যকে নজরে রাখছে। কারণ, অতীতে বিভিন্ন সময়ে সরকার ও দলের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অবস্থান কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। প্রসঙ্গত, রাজ্যের নতুন সরকারের সূচনালগ্নে এই বার্তা প্রশাসনিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দলীয় প্রভাবের বাইরে থেকে সরকার পরিচালনার যে কথা বলা হয়েছে, তা কার্যক্ষেত্রে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটাই আগামী দিনের বড় পরীক্ষা। তবে আপাতত শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার, নতুন সরকার নিজেদের ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার’ হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছে।




