সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: শপথের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনিক দিক থেকে সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সোমবার নবান্নে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ঘোষণা করেন, সরকারি চাকরিতে আবেদনের ঊর্ধ্বসীমা পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যে বিদ্যমান সামাজিক প্রকল্পগুলি চালু থাকবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সেগুলি পরিচালিত হবে বলেও তিনি জানান। সোমবার দুপুর ১২টায় ডাকা এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh), অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul), অশোক কীর্তনিয়া (Ashok Kirtania), ক্ষুদিরাম টুডু (Khudiram Tudu) এবং নিশীথ প্রামাণিক (Nisith Pramanik)। এছাড়াও ছিলেন মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা (Dushmant Nariyawala) ও অন্যান্য শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকরা। বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘সুশাসন এবং সুরক্ষার পথে’ এগোবে তাঁর সরকার এবং ‘ডবল ইঞ্জিন’ মডেল অনুসরণ করেই রাজ্যের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা হবে।
চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় ঘোষণা হল বয়সসীমা বৃদ্ধি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৫ সালের পরে কার্যত কোনও নিয়োগ হয়নি, ফলে বহু শিক্ষিত যুবক-যুবতী বয়সসীমা পেরিয়ে গিয়েছেন’। সেই পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহু প্রার্থী নতুন করে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ রুখতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়ার জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ (Border Security Force, BSF)-কে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘জনবিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে, সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত জরুরি’। ভূমি ও রাজস্ব দফতর এবং মুখ্যসচিবকে দ্রুত এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’ -তে (Ayushman Bharat Pradhan Mantri Jan Arogya Yojana) রাজ্য যুক্ত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা’ (Pradhan Mantri Fasal Bima Yojana), ‘পিএমশ্রী’ (PM SHRI), ‘বিশ্বকর্মা’ (PM Vishwakarma), ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ (Beti Bachao Beti Padhao) এবং ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ (Ujjwala Yojana)-সহ একাধিক প্রকল্প কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলাশাসকদের দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রস্তাব কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (Bharatiya Nyaya Sanhita, BNS) এখন থেকে রাজ্যে কার্যকর হবে। এত দিন পুরনো আইপিসি (Indian Penal Code, IPC) ও সিআরপিসি (Criminal Procedure Code, CrPC) -এর ভিত্তিতেই কাজ চলছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন আইনি কাঠামো অনুযায়ী প্রশাসন পরিচালিত হবে। প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে আইএএস (IAS), আইপিএস (IPS), ডব্লিউবিসিএস (WBCS) ও ডব্লিউবিপিএস (WBPS) আধিকারিকদের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অন্য রাজ্যের মতো নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া হবে’। এর ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। জনগণনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রের পাঠানো জনগণনা সংক্রান্ত নির্দেশ এতদিন কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, ‘আজই সেই সার্কুলার কার্যকর করা হয়েছে’। এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক কাজকর্মে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়াও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভোটার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী, ভোটকর্মী এবং প্রার্থীদের সম্মিলিত ভূমিকার ফলেই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ৩২১ জন বিজেপি (Bharatiya Janata Party, BJP) কর্মীর আত্মবলিদানের কথাও স্মরণ করেন এবং তাঁদের পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকার সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকেই কাজ করবে’ এবং ‘আমরা’-নীতিতে চলার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। আগামী সোমবার পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকে নারী নির্যাতন, বেতন কমিশন, মহার্ঘ ভাতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, প্রথম বৈঠকেই নেওয়া এই ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলির মাধ্যমে প্রশাসনিক গতি বাড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে। চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, আইন কাঠামোর পরিবর্তন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন নজর থাকবে, বাস্তব ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তগুলি কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : DilipGhosh, AgnimitraPaul, DeputyCM: দিলীপ ঘোষ ও অগ্নিমিত্রা পাল উপ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন | বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ




