সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : দেশজুড়ে খাদ্যে ভেজাল নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। ‘ভারতে খাদ্যে ভেজাল মোকাবিলা: বিস্তার, চ্যালেঞ্জ ও সংস্কার’ শীর্ষক এই বৈঠকটি আয়োজন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (National Human Rights Commission বা NHRC)। উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ক্ষেত্রের নানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন এনএইচআরসি-র চেয়ারপার্সন বিচারপতি ভি. রামাসুব্রমণিয়ন (Justice V. Ramasubramanian)। তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে খাদ্যে ভেজাল সমস্যাকে শুধু আইন বা নিয়মের বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত বলে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কথায়, ‘প্রত্যেক মানুষের সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবনযাপনের অধিকার রয়েছে, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য অপরিহার্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু পরিসংখ্যান নয়, ভেজাল খাবারের প্রকৃত প্রভাব বোঝা জরুরি।’
তিনি ভারতের খাদ্য আইন ব্যবস্থার দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরেন, ১৯১৮ সালের মাদ্রাজ ভেজাল প্রতিরোধ আইন (Madras Prevention of Adulteration Act) থেকে শুরু করে ২০০৬ সালের খাদ্য সুরক্ষা ও মান আইন (Food Safety and Standards Act) -এর বিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, বহু ক্ষেত্রে পুরনো রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলা চলার ফলে বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। এনএইচআরসি সদস্য বিচারপতি (ড.) বিদ্যুত রঞ্জন সারঙ্গী (Justice Bidyut Ranjan Sarangi) খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি।’ কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের দিকেও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং গ্রামস্তরে কৃষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
কমিশনের আরও এক সদস্য বিজয়া ভারতী সায়ানি (Vijaya Bharati Sayani) খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে বহুমাত্রিক বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, ‘মোবাইল ফুড টেস্টিং, নিয়মিত পরিদর্শন এবং কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’ পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার কথাও তিনি তুলে ধরেন। এনএইচআরসি-র মহাসচিব ভরত লাল (Bharat Lal) খাদ্যে ভেজালের ফলে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং প্রবীণদের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘একবার ভেজাল পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ঢুকে পড়লে তা চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।’ তাঁর মতে, একটি দূষিত নমুনা শতাধিক মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি আরও জানান, মধ্যাহ্নভোজনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ভেজাল সংক্রান্ত অভিযোগ কমিশনের নজরে এসেছে এবং সে সব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় খাদ্য সুরক্ষা ও মান প্রাধিকরণ (Food Safety and Standards Authority of India বা FSSAI) -এর সিইও রাজিত পুনহানি (Rajit Punhani) জানান, খাদ্য বিক্রেতাদের নিবন্ধন বাড়াতে সচেতনতা অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘রাজ্য সরকারগুলিকেও নিয়মিত লাইসেন্স প্রদান এবং নজরদারি জোরদার করতে হবে।’ পাশাপাশি শূন্যপদ পূরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এই বৈঠকে উঠে আসে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের কথাও। খাদ্যে ভেজাল শনাক্ত করতে সাশ্রয়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) ভিত্তিক সরঞ্জাম তৈরির উপর জোর দেওয়া হয়। গবেষকদের মতে, ‘তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্যের গুণমান যাচাই করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।’ উল্লেখ্য, আইআইটি দিল্লির (IIT Delhi) ড. ঋচা কুমার (Dr. Richa Kumar) ক্ষেত্রস্তরে নজরদারি বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বিপজ্জনক রাসায়নিক ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর জন্য কড়া নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক প্রফেসর বেজন মিশ্র (Bejon Mishra) খাদ্য পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর জোর দেন। বৈঠকে আরও নানা প্রস্তাব উঠে আসে, যেমন খাদ্য সরবরাহের প্রতিটি স্তরে নজরদারি, নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো, স্কুল স্তরে খাদ্য নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরীক্ষাগারগুলির সক্ষমতা বাড়ানো। স্কুল ও কলেজের ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
গবেষক ও অংশগ্রহণকারীদের মতে, খাদ্যে ভেজাল শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবেও বিবেচ্য। তাই এই সমস্যার সমাধানে সরকার, শিল্প এবং সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। এনএইচআরসি জানিয়েছে, বৈঠকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলি খতিয়ে দেখে শীঘ্রই একটি সুসংহত নীতিমালা তৈরি করা হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sanjita Oraon 10000m gold, Khelo India Tribal Games winner | নকশালবাড়ির সঞ্জিতা ওরাওঁর সোনালি সাফল্য, খেলো ইন্ডিয়ায় ১০ হাজার মিটার দৌড়ে দেশসেরা




