সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: দীর্ঘ প্রায় তেরো বছরের বন্দিজীবনের পর অবশেষে জেলমুক্তির পথে সারদা চিটফান্ড কাণ্ডের অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন (Sudipta Sen)। রাজ্যের একাধিক মামলায় জামিন মঞ্জুর হওয়ায় তাঁর মুক্তিতে আর আইনি বাধা থাকল না। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ (Rajarshi Bharadwaj) -এর ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করে। ঘটনাচক্রে, রাজ্যে ভোট আসন্ন আর সেই সময়েই এই রায় ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। বর্তমানে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দী সুদীপ্ত সেন প্রায় ১২ বছর ১১ মাস ধরে কারাবন্দি ছিলেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা বাকি দু’টি মামলায় জামিন মঞ্জুর হওয়ায় তাঁর মুক্তির পথ পরিষ্কার। আদালত জানিয়েছে, মামলাগুলির বর্তমান অবস্থা বিচার করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এত দীর্ঘ সময় বিচার না করে কারাবন্দি রাখা ন্যায়সংগত নয়।
আরও পড়ুন : Rajeev Kumar | রাজীব কুমার বনাম CBI: সারদা মামলায় সুপ্রিম কোর্টে নতুন উত্তেজনা
কিন্তু জামিনের ক্ষেত্রে একাধিক কড়া শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সুদীপ্ত সেনকে পাসপোর্ট জমা রাখতে হবে এবং পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেতে হলে আদালতের অনুমতি নিতে হবে। ঠিকানা পরিবর্তন করলে তদন্তকারী আধিকারিককে জানাতে হবে। কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকা যাবে না। মামলার সাক্ষীদের প্রভাবিত করা নিষিদ্ধ। এছাড়া মোবাইল ফোন সর্বদা চালু রাখতে হবে এবং ‘লাইভ লোকেশন’ সক্রিয় রাখতে হবে। প্রতি মাসে একবার থানায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে তাঁকে। এই রায়ের পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। বেলেঘাটার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) বলেন, ‘কারও জামিন হওয়া বা না-হওয়া আদালতের বিষয়। আইন অনুযায়ী আবেদন করা হয়েছিল এবং আদালত তা মঞ্জুর করেছে। এ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই।’
২০১৩ সালে সারদা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরই সুদীপ্ত সেনের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং আমানত আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। বারাসত থানায় দায়ের হওয়া দুটি মামলাই এতদিন তাঁর মুক্তির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সারা দেশে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৮৯টি মামলা হয়েছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে ৩৮৭টিতেই তিনি ইতিমধ্যে জামিন পেয়েছেন। সুদীপ্ত সেনের আইনজীবী সাবির আহমেদ (Sabir Ahmed) এবং সুজয় সরকার (Sujay Sarkar) আদালতে দাবি করেন, তাঁদের মক্কেল দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীন অবস্থায় কারাবন্দী রয়েছেন। এক মামলায় চার্জশিট জমা পড়ার পরও দীর্ঘ সময় নথিপত্র সরবরাহ করা হয়নি, অন্য একটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে গিয়েছে। ফলে বিচার কার্যত থমকে রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, ‘এত দীর্ঘ সময় জেলে রাখা সম্ভাব্য শাস্তির থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
রাজ্যের তরফে জানানো হয়, সারদা কেলেঙ্কারি অত্যন্ত গুরুতর এবং বহু মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে একটি মামলার নথি হারিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করা হয়। এই পরিস্থিতিতে কঠোর শর্তে জামিনে আপত্তি নেই বলেও আদালতে জানানো হয়। অন্যদিকে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই (CBI) জানায়, তাদের অধীনে থাকা ৭৭টি মামলার সবকটিতেই সুদীপ্ত সেন জামিন পেয়েছেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। এই অবস্থায় তাঁকে আরও জেলে রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মত তদন্তকারী সংস্থার। হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানায়, মামলাটি বিচার ব্যবস্থার এক গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় নথি না দেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করা হয়। আদালত আরও জানায়, অভিযুক্তের দ্রুত বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং বিচার শুরু না হওয়া অবস্থায় এত দীর্ঘ সময় কারাবন্দী রাখা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ৫,০০০ টাকার বন্ডে এবং দু’জন জামিনদারের মাধ্যমে জামিন পাবেন সুদীপ্ত সেন। পাশাপাশি, হারিয়ে যাওয়া নথি দ্রুত পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নিম্ন আদালতকে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সারদাকাণ্ড সামনে আসার পর সুদীপ্ত সেন তাঁর সহযোগী দেবযানী মুখার্জিকে (Debjani Mukherjee) নিয়ে কাশ্মীরের সোনমার্গে আত্মগোপন করেছিলেন। পরে সেখান থেকেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। তারপর থেকেই তাঁরা জেলে ছিলেন। ২০২৩ সালে দেবযানী স্বল্প সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি পান। এই মামলায় রাজ্যের পাশাপাশি সিবিআই, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি (ED) এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া বা সেবি (SEBI) পৃথকভাবে তদন্ত চালিয়েছে। বহু আমানতকারী এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযোগ দায়ের করেন। উল্লেখ্য, সুদীপ্ত সেনের সম্ভাব্য মুক্তি এখন শুধু আইনি পরিসরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরেও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভোটের আগে এই ঘটনা নতুন করে সারদা কাণ্ডকে সামনে এনে দিয়েছে এবং জনমনে নানা প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : West Bengal Assembly Elections 2026, Mamata Banerjee speech | নবগ্রামে মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘৪০ হাজার নাম বাদ’, বিজেপি-কংগ্রেসকে একসঙ্গে আক্রমণ




