সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়-তরাই অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম নকশালবাড়ি থেকে উঠে এসে জাতীয় ক্রীড়া মঞ্চে সোনালি সাফল্যের গল্প লিখলেন সঞ্জিতা ওরাওঁ (Sanjita Oraon)। ‘খেলো ইন্ডিয়া ট্রাইবাল গেমস’ (Khelo India Tribal Games) -এর ১০ হাজার মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জিতে তিনি শুধু নিজের নয়, গোটা রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সীমিত সুযোগ, আর্থিক অনটন এবং পরিকাঠামোর ঘাটতির মধ্যেও তাঁর এই সাফল্য নতুন আলো ফেলেছে গ্রামীণ প্রতিভার উপর। এই প্রথমবার দেশের আদিবাসী ক্রীড়াবিদদের জন্য পৃথকভাবে আয়োজন করা হয় ‘খেলো ইন্ডিয়া ট্রাইবাল গেমস’। ছত্তীসগঢ় (Chhattisgarh) -এ আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে প্রায় ৩ হাজার ক্রীড়াবিদ অংশ নেন। ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই ক্রীড়া আসরে সাতটি ভিন্ন খেলা ছিল, যেখানে প্রতিটি বিভাগেই ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেই প্রতিযোগিতারই দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে নজর কেড়েছেন সঞ্জিতা।
১০ হাজার মিটার দৌড়ে সঞ্জিতা সময় নিয়েছেন ৪০ মিনিট ২১.৮ সেকেন্ড। এই পারফরম্যান্স তাঁকে সবার থেকে এগিয়ে এনে দিয়েছে স্বর্ণপদকের শীর্ষে। একই প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের ফুটবল দলও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তবে ব্যক্তিগত বিভাগে সঞ্জিতার এই জয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সঞ্জিতার জীবনযাত্রা সহজ ছিল না। তাঁর বাবা বিজয় ওরাওঁ (Bijoy Oraon) পেশায় দিনমজুর এবং মা রিতা ওরাওঁ (Rita Oraon) গৃহবধূ। প্রতিদিনের জীবন ছিল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে এগোনো। সেই অবস্থাতেই নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে দৌড় চালিয়ে গেছেন সঞ্জিতা। তাঁর এই যাত্রাপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন হাতিঘিসা উচ্চবিদ্যালয়ের (Hatighisa High School) শিক্ষক সুজয় ঘোষ রায় (Sujay Ghosh Roy)। সুজয় ঘোষ রায়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে অনুশীলন করতেন সঞ্জিতা। নিয়মিত ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড সুবিধা না থাকায় তাঁকে অনেক সময় চা-বাগানের মধ্যে দৌড়ে অনুশীলন করতে হয়েছে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। কাদামাটি, অসমতল জমি, সব বাধা পেরিয়ে তিনি নিজের প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘সুবিধা কম ছিল, কিন্তু দৌড় থামাইনি কখনও।’
এই জয় শুধু একটি পদক নয়, বরং এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। গ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা এক কন্যার জন্য এই সাফল্য অনেক বড় প্রাপ্তি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই জয় নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সঞ্জিতার এই সাফল্য এলাকার আরও অনেক তরুণ-তরুণীকে খেলাধুলার দিকে আগ্রহী করে তুলবে। সঞ্জিতার এই কৃতিত্বের জন্য তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তিনি তাঁর এক্স (X) হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘নকশালবাড়ির আদিবাসী চা-শ্রমিক পরিবারের মেয়ে সঞ্জিতা ওরাওঁ জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় দশ হাজার মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জয়ের জন্য অভিনন্দন প্রাপ্য। এই জয় বাংলার জন্য গর্বের।’ তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি কখনও প্রতিভাকে থামাতে পারে না, সঞ্জিতা তার প্রমাণ।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সঞ্জিতার ভবিষ্যৎ পথচলায় রাজ্য সরকার পাশে থাকবে। তাঁর এই মন্তব্যের পর ক্রীড়া মহলেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে।
খেলো ইন্ডিয়া ট্রাইবাল গেমস-এর মতো প্ল্যাটফর্ম দেশের প্রান্তিক এলাকার প্রতিভাদের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই মঞ্চ থেকেই উঠে আসছে নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ, যারা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্তরেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। সঞ্জিতা ওরাওঁর এই জয় কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি এক বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে সীমিত সুযোগের মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব। তাঁর গল্প ইতিমধ্যেই বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে, এবং আগামী দিনে তা আরও অনেককে এগিয়ে যেতে সাহস জোগাবে।
বর্তমানে সঞ্জিতা নিজের পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করতে চান। জাতীয় স্তরের এই সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বপ্নও দেখছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এখানেই থামতে চাই না, আরও বড় মঞ্চে দেশের জন্য কিছু করতে চাই।’ উল্লেখ্য, নকশালবাড়ির এই কন্যার সাফল্য তাই কেবল একটি পদক জয়ের গল্প নয়, এটি এক অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিচ্ছবি, যা ভবিষ্যতের পথকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Virat Kohli Records 2026 | বিরাট কোহলি: ২০২৬ সালেই চারটি রেকর্ডের সামনে ভারতীয় ক্রিকেট মহাতারকা




