সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : নতুন দিল্লি/লন্ডন: মানুষের শরীরের খুঁটিনাটি নজর রাখতে স্মার্টওয়াচ (Plant wearable smartwatch technology) এখন নিত্যসঙ্গী। এবার সেই প্রযুক্তিই পৌঁছে যাচ্ছে কৃষিক্ষেত্রে। অদূর ভবিষ্যতে গাছপালাও যেন ‘স্মার্ট ডিভাইস’ পরে নিজের অবস্থার খবর জানাবে কৃষকদের। এমনই এক অভিনব প্রযুক্তি সামনে এনেছেন ব্রিটেনের গবেষকরা, যেখানে গাছের পাতায় ট্যাটুর মতো ক্ষুদ্র সেন্সর এবং কাণ্ডে বিশেষ ব্যান্ড বসিয়ে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ACS Applied Materials & Interfaces জার্নালে। গবেষণায় যুক্ত টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় (Tufts University) -এর বিজ্ঞানীদের দাবি, এই যন্ত্রের সাহায্যে গাছের অসুস্থতা, পানির অভাব বা পুষ্টির ঘাটতি চোখে ধরা পড়ার কয়েক দিন আগেই শনাক্ত করা যাবে। ফলে কৃষকরা আগেভাগেই ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং ফসলের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। গবেষক দলের একজন সদস্য জানিয়েছেন, ‘গাছের অবস্থার পরিবর্তন আমরা অনেক সময় দেরিতে বুঝতে পারি। এই সেন্সর সেই ব্যবধান কমিয়ে আনবে।’ এই প্রযুক্তির মূল আকর্ষণ হল, এটি চালাতে কোনও আলাদা ব্যাটারি বা বিদ্যুৎ উৎসের প্রয়োজন নেই। গাছ নিজেই তার প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি করবে।
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গাছের পাতা থেকে যে আর্দ্রতা নির্গত হয়, যাকে সহজভাবে গাছের ‘ঘাম’ বলা যেতে পারে, সেই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে এই সেন্সর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই ক্ষুদ্র শক্তি দিয়েই সেন্সরটি কাজ চালিয়ে যায়। গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে ভ্যানাডিয়াম পেন্টক্সাইড (Vanadium Pentoxide) ক্রিস্টাল ও গ্রাফিন (Graphene)-এর বিশেষ স্তর, যা সেন্সরটিকে অত্যন্ত পাতলা ও নমনীয় করে তুলেছে। ফলে এটি গাছের পাতায় ট্যাটুর মতো লেগে থাকতে পারে এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে কোনও বাধা সৃষ্টি করে না। শুধু পাতায় সেন্সর নয়, গাছের কাণ্ডের চারপাশে একটি বিশেষ ফিতা বা ব্যান্ডও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ব্যান্ডটির নকশা জাপানি শিল্প ‘কিরিগামি’ (Kirigami) থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে কাগজ কেটে বিভিন্ন আকার তৈরি করা হয়। এই নকশার কারণে ব্যান্ডটি গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রসারিত হতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে গাছের ওপর এটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
এই ব্যান্ডে একটি বিশেষ আয়ন-পরিবাহী জেল ব্যবহার করা হয়েছে, যা গাছের কাণ্ডের আকারের পরিবর্তন পরিমাপ করতে পারে। গাছ সুস্থ থাকলে কাণ্ড স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হয়, কিন্তু চাপের মধ্যে থাকলে তা সংকুচিত হতে পারে। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো দ্রুত শনাক্ত করে সেন্সরটি তথ্য সংগ্রহ করে। ল্যাবরেটরিতে বেল পেপার (Bell Pepper) গাছের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, জলের অভাবে থাকা গাছ ও অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটিতে থাকা গাছের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে সেন্সরটি সক্ষম হয়েছে। সুস্থ গাছের আর্দ্রতা শোষণ ও নির্গমনের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকলেও সমস্যাগ্রস্ত গাছের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন ধরা পড়েছে।
গবেষকদের মতে, ‘ফসলের ক্ষতির প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে পানির অভাব, মাটির গুণগত সমস্যা এবং পরিবেশগত চাপ। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সেই সমস্যাগুলি আগেভাগেই শনাক্ত করা যাবে।’ ফলে কৃষকরা সঠিক সময়ে সেচ বা সার প্রয়োগের মতো পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর স্থায়িত্ব। পরীক্ষায় দেখা গেছে, তীব্র বাতাস বা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও সেন্সরটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। ফলে মাঠ পর্যায়ে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা থাকার সম্ভাবনা কম।
বর্তমানে গবেষক দল একটি তারবিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে, যার মাধ্যমে এই সেন্সর থেকে সংগৃহীত তথ্য সরাসরি কৃষকদের মোবাইল ফোনে পৌঁছে দেওয়া যাবে। ব্লুটুথ (Bluetooth) অথবা লং-রেঞ্জ নেটওয়ার্ক (LoRa Network) -এর মাধ্যমে এই তথ্য আদানপ্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে কৃষকরা বাড়িতে বসেই নিজেদের ফসলের অবস্থা জানতে পারবেন। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এক বিজ্ঞানীর কথায়, ‘আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই, যেখানে গাছ নিজেই তার সমস্যার কথা জানাবে।’ ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে গাছের হরমোনের পরিবর্তন, ফলের বৃদ্ধি এবং উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কেও তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, ড্রোন নজরদারি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, সব মিলিয়ে আধুনিক কৃষি নতুন রূপ নিচ্ছে। সেই ধারাতেই এই ‘প্ল্যান্ট ওয়্যারেবল’ প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উঠে আসছে। এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হলে কৃষকদের জন্য বড় সুবিধা তৈরি হতে পারে। ফসলের ক্ষতি কমানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে জলসংকট বা পরিবর্তিত আবহাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় এই ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়ে কৃষি খাতে যখন টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন এই ধরনের উদ্ভাবন ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও দক্ষ করে তুলতে পারে। গাছের ‘স্মার্টওয়াচ’ প্রযুক্তি সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে প্রকৃতি ও প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Village Action Plan Malda, Vibrant Villages Programme India | সীমান্তে উন্নয়নের নতুন নকশা: মালদহে প্রথম ‘ভিলেজ অ্যাকশন প্ল্যান’, গ্রামবাসীর মতেই তৈরি হবে ভবিষ্যৎ রূপরেখা


